Do to others what you would have them do to you, for this sums up the Law and the Prophets. (Gospel according to Matthew 7:12)
Stand out firmly with justice as witnesses for God, even if it be against yourselves or parents and relatives, be he rich or poor. (Koran 4:135)

শুক্রবার, ২ মে, ২০১৪

নারীর কোরান – ৯ (বিমা)

৯.১। এই পর্বে কোরানের ৪:৩৪ আয়াতের রিজাল বাক্যটি নিয়ে আলোচনা করব। এই বচনের তিন ধরণের অনুবাদ রয়েছে। এই ধরণ-বৈচিত্র্য এসেছে ‘কাওয়াম’ ও ‘বিমা’ পদ দুটির অর্থের বৈচিত্র্য থেকে। আমরা আগের পর্বে দেখেছি যে, ‘কাওয়াম’ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে কেউ ‘কর্তৃত্বাধিকারী’, কেউ ‘রক্ষণকারী’ ইত্যাকার শব্দ অবলম্বন করেছেন। অন্যদিকে ‘বিমা’ পদের অর্থ নেয়া হয়েছে ‘যেহেতু’ হিসেবে। আমরা নীচে তিন প্রকৃতির পাঁচটি অনুবাদ উল্লেখ করা গেল।

ক.

Sahih International— Men are in charge of women by [right of] what Allah has given one over the other and what they spend [for maintenance] from their wealth.

Pickthall— Men are in charge of women, because Allah hath made the one of them to excel the other, and because they spend of their property.

খ.

Yusuf Ali— Men are the protectors and maintainers of women, because Allah has given the one more (strength) than the other, and because they support them from their means.

Muhammad Sarwar— Men are the protectors of women because of the greater preference that God has given to some of them and because they financially support them.

গ.

Muhammad Asad— MEN SHALL take full care of women with the bounties which God has bestowed more abundantly on the former than on the latter, and with what they may spend out of their possessions.

৯.২। ‘বিমা’ শব্দের অর্থ

৯.২.১। ‘বি’ শব্দের অর্থ ‘সহকারে’ এবং ‘মা’ শব্দের অর্থ ‘যাহা’—ইংরেজিতে সম্পূর্ণটিকে বলা যায় ‘with what’। ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে আমরা বুঝি ‘আল্লাহর নাম সহকারে’। কোরানের অনেক স্থানেই এই অর্থ আমরা পাই। খোদ ৪:৩৪ আয়াতটিতেই—যা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি—তার নজির রয়েছে। আমরা পরে সংশ্লিষ্ট বাক্যটি নিয়ে আলোচনাকালে তা দেখব।

৯.২.২। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সহিহ ইন্টারন্যাশনাল ‘বিমা’ পদের অর্থ করেছে ‘সহকারে’ (by) অভিধাযুক্ত ইংরেজি শব্দ দিয়ে; যদিও আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, বন্ধনীর মধ্যে ‘রাইট অফ’ কথাটি নিজ থেকে যোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, পিকথল, ইউসুফ আলী ও মুহম্মদ সরওয়ার করেছেন ‘because’। আর মুহম্মদ আসাদ অনুবাদে গ্রহণ করেছেন ‘with’ ও ‘with what’ যা বাংলায় ‘সহকারে’।

৯.২.৩। তাছাড়াও কোরানের ২:৭৬, ৩:৭৯, ৩:১৫১, ৫:৭৮, ৭:১৩৪, ৭:১৩৭ আয়াতেও ‘বিমা’ শব্দের ব্যবহার রয়েছে। এদের মধ্যে ২:৭৬ আয়াতে ‘যেহেতু’ অর্থ কোনভাবেই প্রয়োগ করা যায় না; সেখানে আমার জানামতে সকলেই ‘because’ এর পরিবর্তে ‘about what’, ‘that which’, ‘of what’ ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। ৩:৭৯ আয়াতে অনেকেই ‘because’ ব্যবহার করেছেন, যদিও ‘with what’ আরও ভালভাবে আয়াতটিকে তাৎপর্যমণ্ডিত করে—যেকারণে আরবেরি ‘in that’ এবং পিকথল ‘by virtue of’ ব্যবহার করেছেন। একই দাবী ৩:১৫১, ৫:৭৮, ৭:১৩৪ আয়াতের বেলাতেও করা যায়। তবে ৭:১৩৭ আয়াতে আমার জানা সকলেই ‘because’ শব্দ ব্যবহার করেছেন ও তাতে অর্থ সহজবোধ্য হয়। কাজেই একথা বলা সম্ভব যে, ‘বিমা’ শব্দের অর্থ প্রধানত ‘তা/যা সহকারে’, এবং অবধারিতভাবে ‘যেহেতু’ নয়।

৯.৩। রিজাল বচনটির তিনটি অংশ রয়েছে। আমরা উপরের তিনটি অনুবাদকে সহজ করে তিনটি বাংলা বচন তৈরি করলাম বিশ্লেষণের সহজতার জন্য।

i.

পুরুষ নারীর কর্তা
যেহেতু
তার সামর্থ্যে আধিক্য রয়েছে
এবং যেহেতু
সে তার সম্পদ থেকে ব্যয় করে।

ii.

পুরুষ নারীর রক্ষক
যেহেতু
তার সামর্থ্যে আধিক্য রয়েছে
এবং যেহেতু
সে তার সম্পদ থেকে ব্যয় করে।

iii.

পুরুষ নারীর প্রতি যত্নবান
তার সামর্থ্যের আধিক্য
সহকারে, এবং
তার ব্যয়যোগ্য সম্পদ
সহকারে।

৯.৪। সিন্টেক্স ও সিমেন্টিক্স এর দিক থেকে রিজাল বচনটি কিরকম? অর্থ ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে বাক্যটির তিন রকম অর্থ হতে পারে:

৯.৪.১। কর্তৃত্বের আসন অনুমোদন মূলক বচন

পুরুষকে নারীর উপর কর্তার আসন দেয়া হলো
যেহেতু
পুরুষের সামর্থ্যে আধিক্য রয়েছে
এবং যেহেতু
পুরুষ সম্পদ থেকে ব্যয় করে।

এক্ষেত্রে বিমা শব্দের অর্থ হিসেবে ‘যেহেতু’ শব্দটি উপযুক্ত, যেখানে ২য় ও ৩য় বাক্যাংশ এই আসনে নিযুক্তির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে। এই বচন গঠন ও যৌক্তিক সঙ্গতি উভয় দিক থেকে যথাযথ। কিন্তু আমরা গত পর্বে দেখেছি যে, ‘কাওয়াম’ শব্দের অর্থ আদতে ‘কর্তা’ নয়—কাজেই এই অনুবাদ বাতিলযোগ্য।

৯.৪.২। দায়িত্ব অর্পণ মূলক বচন ও ‘যেহেতু’

পুরুষ নারীর রক্ষক হবে ... ... ... (১)
যেহেতু
পুরুষের সামর্থ্যে আধিক্য রয়েছে ... ... ... (২)
এবং যেহেতু
পুরুষ সম্পদ থেকে ব্যয় করে। ... ... ... (৩)

দায়িত্ব অর্পণ মূলক এইরূপ বচনকে নিঃসন্দেহে সিনথেটিক হতে হবে;—এনালাইটিক নয়। এদিক থেকে বচনটির (২) অংশ নিয়ে কোন সমস্যা হয় না; কারণ কারও সামর্থ্য বেশী থাকাটা তার উপর দায় আরোপের জন্য ভাল যুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন: রহিমকে জামালের রক্ষায় এগিয়ে আসা উচিত, যেহেতু রহিমের সামর্থ্যে আধিক্য রয়েছে। এরূপ বাক্য রহিমের ভূমিকা বা দায়িত্ব নির্ধারণ করে এবং সে দায়িত্ব আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। কিন্তু এরূপ বিচারে (৩) অংশটি গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। আমরা নীচে বাক্যটিকে ভেঙ্গে উল্লেখ করলাম:

পুরুষ নারীর রক্ষক হবে যেহেতু পুরুষ সম্পদ থেকে ব্যয় করে।

এই বচনের দ্বিতীয় অংশ প্রথম অংশের পক্ষে সবল কোন যুক্তি হতে পারে না। যে রক্ষক হবে তার দায়িত্ব হতে পারে সম্পদ থেকে ব্যয় করা। এই ব্যয়কাজ রক্ষণাবেক্ষণের দায় থেকে জাত কাজ, যা দায় আরোপের কারণ বা যুক্তি হতে পারে না। এটি অনেকটাই একটি এনালাইটক বচনের ন্যায়। কুমার অবিবাহিত যেহেতু কুমার বিবাহ করে না—বচনটি এরূপ বচনের ন্যায়, যা দায়িত্ব অর্পণমূলক বচন নয়। অথবা যেমন: কামাল সংস্থাটির সিইও-এর দায়িত্ব পালন করবে, যেহেতু সে ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করে থাকে—এই বচন খুবই দুর্বল। বরং, যেহেতু কামাল সিইও, সেহেতু সে ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করবে—এই বাক্যটি সবল।

কিন্তু "পুরুষ নারীর সমর্থনে মজবুতভাবে দাঁড়াবে, তার সামর্থ্যের আধিক্য সহকারে, এবং তার ব্যয়যোগ্য সম্পদ সহকারে"—এরূপ বাক্য পুরুষের দায়িত্ব নির্ধারণ করে ও দায়িত্ব পালনের পন্থা ব্যাখ্যা করে। একই সাথে পুরুষতন্ত্রের পোষকরা প্রাচীন কাল থেকে যে যুক্তি দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্বমূলক অবস্থানকে সিদ্ধ করে আসছিল, আল্লাহ সেই কথাকেই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিসর ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করছেন মর্মে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

আমরা আগের পর্বে দেখেছি যে, securer, protector, maintainer ইত্যাকার শব্দের সাথে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার অনুষঙ্গ আমাদেরকে বিপদে ফেলে। আজ আমরা দেখলাম এই ধরণের শব্দ ‘যেহেতু’ এর সাথে যুক্ত হলে কিভাবে বচনের গাঠনিক সংহতি নষ্ট করে। কাজেই এই ‘বিমা’ পদের জন্য ‘যেহেতু’ শব্দ ব্যবহার করে এই ধরণের অনুবাদ পরিত্যাগ করাই সমীচীন।

৯.৪.৩। দায়িত্ব অর্পণ মূলক বচন ও ‘সহকারে’

পুরুষ নারীর প্রতি যত্নবান হবে
তার সামর্থ্যের আধিক্য সহকারে, এবং
তার ব্যয়যোগ্য সম্পদ সহকারে।

মুহম্মদ আসাদ যে অনুবাদ করেছেন তার সিন্টেক্স ও সিমেন্টিক্স উপরের বচনের ন্যায়। অর্থ ও গঠনের দিক থেকে এটি সংহত ও চমৎকার বচন। কিন্তু ‘কাওয়াম’ শব্দকে তার মূল অর্থ ‘মজবুতভাবে দণ্ডায়মান’ গ্রহণ করলে আমরা আরও বলিষ্ঠ ও ব্যাপক অর্থ পেতে পারি।

৯.৫। বাক্যের যুক্তিসঙ্গত অনুবাদ

আর্‌রিজালু কাওয়ামুনা আলা ন্‌নিসায়ি বিমা ফাদ্দালাল্লাহু বায়্‌দাহুম আলা বায়্‌দিন ওয়া বিমা আনফাকু মিন আমওয়ালিহিম।

“Men are those who persistently stand firm for women with what God has given the one more than the other, and with what they spend of their property.”

পুরুষরা নারীদের সমর্থনে মজবুতভাবে দাঁড়ায়, আল্লাহ এককে অপরের তুলনায় যে সামর্থ্যগত আধিক্য দিয়েছেন তা নিয়ে, এবং তাদের সম্পদের ব্যয়যোগ্য অংশ নিয়ে।

নারীর কোরান – ৮ (কাওয়াম)

৮.১। কোরানের চতুর্থ সুরা নিসা’র ৩৪ নং আয়াতটির প্রচলিত অর্থ ও ব্যাখ্যা নারীর উপর পুরুষের উগ্র বা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে “বৈধতা” দিয়েছে। এই আয়াত নারী সংক্রান্তে সবচে বিতর্কিত আয়াত হয়ে উঠেছে—যেখানে স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি বা নির্দেশ রয়েছে বলা হয়, এবং এমনকি “অবাধ্য” বা “নাফরমান” স্ত্রীকে “অবাধ্যতা” বা “নাফরমানী”র কেবলমাত্র আশংকার ভিত্তিতেই স্বামীকে স্ত্রী-প্রহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে সাব্যস্ত করা হয়। বাঙালী মুসলিম সমাজে যারা ইসলামপন্থী বলে পরিচিত তারা যেসব বাংলা অনুবাদক ও তফসিরকারককে নির্ভরযোগ্য ও মান্য বলে মনে করেন তাদের অনুবাদ ও তফসিরে যা লিখিত আছে তা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও দুঃখজনক। কিন্তু মূল আরবিতে কোরানের এই আয়াত কি সত্যই এরূপ আধিপত্যের কথা বলে?

৮.২। রিজাল বাক্য (৪:৩৪ আয়াতের ১ম বাক্য)

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ

বাংলা ট্রান্সলিটারেশন:—আর্‌রিজালু কাওয়ামুনা আলা ন্‌নিসায়ি বিমা ফাদ্দালা ল্লাহু বায়্‌দাহুম আলা বায়্‌দিন ওয়া বিমা আনফাকু মিন আমওয়ালিহিম।

পুরুষতন্ত্র সহায়ক অনুবাদ:—Men are the managers of women, because God hath made the one of them to excel the other, and because they spend of their property.

মধ্যপন্থী অনুবাদ:—Men are the protectors and maintainers of women, because God has given the one more than the other, and because they support them from their means.

এই বাক্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ:—কাওয়ামুনা, বিমা ও ফাদ্দালা। এই পর্বে ‘কাওয়াম’ পদের যুক্তিসঙ্গত অর্থ নির্ধারণের চেষ্টা করা হলো। পরের পর্বে ‘বিমা’ ও ‘ফাদ্দালা’ পদের অর্থ নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব এবং শেষে এই বাক্যের একটি বাংলা অনুবাদ প্রস্তাব করা সম্ভব হবে। কাওয়াম শব্দের অর্থ ‘কর্তা’ বা ‘রক্ষক’ করে এবং ‘বিমা’ পদের অর্থ ‘তা সহ’ না করে ‘যেহেতু’ করে কিভাবে অবিচার ও অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছে তা আমরা দেখার চেষ্টা করব।

৮.৩। কাওয়াম

৮.৩.১। ত্রি-অক্ষর শব্দমূল:— ক্কাফ ওয়াও মীম।

এই মূল থেকে জাত তিনটি প্রধান ক্রিয়া পদের অর্থ:

কামা — to stand up, to rise, to establish.
আকামা — to establish.
ইসতাকামু — to be upright, to be straight, to stand firm

‘কাওয়াম’ এর জন্য ইংরেজি অনুবাদকদের ব্যবহৃত শব্দ:

উগ্র অর্থ:— in charge, manager.
মৃদু অর্থ:— protector & maintainer, securer.

৮.৩.২। এই আয়াতের ‘কাওয়াম’ শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইউসুফ আলী লিখেছেন:

Qawwam: one who stands firm in another’s business, protects his interests, and looks after his affairs; or it may be, standing firm in his own business, managing affairs, with a steady purpose.

কোরানের ৪:১৩৫ ও ৫:৮ আয়াতে কাওয়াম শব্দের অর্থ বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন:

Justice is Allah’s attribute, and to stand firm for justice is to be a witness to Allah, even if it is detrimental to our own interests (as we conceive them) or the interests of those who are near and dear to us.

৮.৩.৩। বর্তমান ৪:৩৪ আয়াতের ‘কাওয়াম’ শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মুহম্মদ আসাদ লিখেছেন:

The expression qawwam is an intensive form of qa’im (“one who is responsible for” or “takes care of” a thing or a person). Thus, qama ‘ala l-mar’ah signifies “he undertook the maintenance of the woman” or “he maintained her” (see Lane VIII, 2995). The grammatical form qawwam is more comprehensive than qa’im, and combines the concepts of physical maintenance and protection as well as of moral responsibility: and it is because of the last-named factor that I have rendered this phrase as “men shall take full care of women”.

৮.৪। বিভিন্ন অনুবাদে কাওয়াম

এবার দেখা যাক ৪:৩৪ আয়াতের অনুবাদে কাওয়াম শব্দের অর্থ করতে গিয়ে কোন অনুবাদক কি লিখেছেন:

Sahih International — Men are in charge of women

Pickthall — Men are in charge of women

Sher Ali — Men are guardians over women

Daryabandi — Men are overseers over women

Muhammad Sarwar — Men are the protectors of women

Shakir — Men are the maintainers of women

Yusuf Ali — Men are the protectors and maintainers of women

Mohsin Khan — Men are the protectors and maintainers of women

Shehzaz — Men are protectors and maintainers of women

Arberry — Men are the managers of the affairs of women

Muhammad Asad — MEN SHALL take full care of women

ইবন কাসিরের অনুবাদ — পুরুষেরা নারীদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত

মউদুদির অনুবাদ — পুরুষ নারীর কর্তা

কুতুবের অনুবাদ — পুরুষরা হচ্ছে নারীদের (কাজকর্মের) উপর প্রহরী

মুহম্মদ শফির অনুবাদ — পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ — পুরুষ নারীর কর্তা

৮.৫। কাওয়ামুন বনাম কাওয়ামিন

৮.৫.১। ‘কাওয়ামিন’ পদটি আছে কোরানের ৪:১৩৫ ও ৫:৮ আয়াতে। একই সুরা নিসা’র সম্পূর্ণ ১৩৫ আয়াতটির অনুবাদ সহি ইন্টারন্যাশনাল অনুযায়ী নিম্নরূপ:

“O you who believe! Be persistently standing firm in justice, as witnesses for God, even if it is against yourselves or your parents or relatives whether rich or poor, for God is nearer to both of them. So do not follow the desires, lest you deviate. And if you distort or fall away, then indeed, God is All-Aware of what you do.” [4:135]

এবার দেখা যাক এই আয়াতে কাওয়াম শব্দের কে কিভাবে অনুবাদ করেছেন:

Sahih International — O you who have believed, be persistently standing firm in justice

Yusuf Ali — O ye who believe! stand out firmly for justice

Mohsin Khan — O you who believe! Stand out firmly for justice

Muhammad Sarwar — Believers, be the supporters of justice

Muhammad Asad — O YOU who have attained to faith! Be ever steadfast in upholding equity

Pickthall — O ye who believe! Be ye staunch in justice

Shakir — O you who believe! be maintainers of justice

Daryabandi — O Ye who believe! be ye maintainers of justice

Arberry — O believers, be you securers of justice

Sher Ali — O ye who believe! be strict in observing justice

Shehnaz — O you who believe! Be custodians of justice

ইবন কাসিরের অনুবাদ — হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহরে উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দানকারী, সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও

মউদুদির অনুবাদ — হে ঈমানদারগণ! ইনসাফের পতাকাবাহী ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও

কুতুবের অনুবাদ — হে ঈমানদারেরা, তোমরা (সর্বদাই) ইনসাফের উপর (দৃঢ়ভাবে) প্রতিষ্ঠিত থেকো

মুহম্মদ শফির অনুবাদ — হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ — হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকিবে।

৮.৫.২। কোরানের ৫:৮ পূর্ণ আয়াতটির অনুবাদ সহি ইন্টারন্যাশনাল অনুযায়ী নিম্নরূপ:

O you who believe! Be persistently standing firm for God, witnesses in justice, and do not let the hatred of a people prevent you from being just. Be just; that is nearer to righteousness. And fear God; indeed, God is Acquainted with what you do. [5:8]

এবার দেখা যাক এই আয়াতে কাওয়াম শব্দের কে কিভাবে অনুবাদ করেছেন:

Sahih International — O you who have believed, be persistently standing firm for Allah

Yusuf Ali — O ye who believe! stand out firmly for Allah

Mohsin Khan — O you who believe! Stand out firmly for Allah

Pickthall — O ye who believe! Be steadfast witnesses for Allah

Muhammad Sarwar — Believers, be steadfast for the cause of God

Sher Ali — O ye who believe! be steadfast in the cause of God

Muhammad Asad — O YOU who have attained to faith! Be ever steadfast in your devotion to God

Shakir — O you who believe! Be upright for Allah

Arberry — O believers, be you securers of justice

Shehnaz — O you who believe! Be steadfast for Allah

Daryabandi — O ye who believe! be maintainers of your pact with Allah

ইবন কাসিরের অনুবাদ — হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিধানসমূহ পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠাকারী ও ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্য দানকারী হয়ে যাও

মউদুদির অনুবাদ — হে ঈমানদারগণ! সত্যের উপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও

কুতুবের অনুবাদ — হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা আল্লাহর জন্য (সত্য ও) ন্যায়ের উপর সাক্ষী হয়ে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকো

মুহম্মদ শফির অনুবাদ — হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ — হে বিশ্বাসিগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকিবে

৮.৬। তিন আয়াতে শব্দের ব্যবহার

৮.৬.১। নীচে নানা অনুবাদের একটি তুলনামূলক চিত্র দেয়া হলো।



৮.৬.২। দেখা যাচ্ছে, ঈশ্বর ও ন্যায়বিচারে ক্ষেত্রে কাওয়াম শব্দের অর্থে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়ানোর অভিধাই প্রাধান্য পেয়েছে। রক্ষণশীলরাও নির্দ্বিধায় “persistently standing firm”, “upright”, “stand out firmly” ইত্যাদি এক্সপ্রেশন ব্যবহার করেছেন। কিন্তু নারীদের প্রসঙ্গে তারা “in charge”, “overseer” “protector”, “maintainer” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন। কাওয়ামিন ও কাওয়ামুন এর মধ্যে মূল অর্থগত কোন পার্থক্য নেই: দুটোই Noun: কাওয়ামিন accusative noun রূপ এবং কাওয়ামুন nominative noun রূপ। উল্লেখ্য যে, আরবি ভাষার মতো বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় accusative noun বলে বিশেষ্যর কোন রূপ নেই। ৪:১৩৫ ও ৫:৮ আয়াতে বলা হয়েছে, কুনু কাওয়ামিনা—অর্থাৎ কাওয়ামিন হও। যে ‘কাওয়ামিন হয়েছে’ সে ‘কাওয়ামুন’। কাজেই কাওয়ামুন হচ্ছে সে যে সমর্থনে দৃঢ়তার সাথে দণ্ডায়মান হয়েছে।

৮.৬.৩। আগের ৮.৩.৩ অনুচ্ছেদে মুহম্মদ আসাদের ব্যাখ্যায় আমরা দেখেছি যে, কাওয়াম শব্দটি কায়িম শব্দ থেকেও অধিক তাৎপর্য বহন করে। কোন কিছুর সমর্থনে, রক্ষার্থে যে দাঁড়ায় তাকে কায়িম বলা যায়। কিন্তু এই দাঁড়াতে গিয়ে যখন নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়, বাধা অতিক্রম করতে হয়, কষ্ট বা ক্ষতি স্বীকার করতে হয়, উদ্যোগী হয়ে কর্মতৎপর হতে হয় তখন এ ধরণের দাঁড়ানেওয়ালার জন্য কাওয়াম শব্দটি ব্যবহার করা যায়।

৮.৬.৪। নারীর পক্ষে মজবুতভাবে দাঁড়ানোর অর্থ এটা হতেই পারে না যে, তা নারীর স্বার্থের বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে হবে; বা এটি নারীকে দুর্বল করে রেখে বা তার কাছ থেকে তার নিজের কর্তৃত্বকে কেড়ে নিয়ে জোর করে প্রয়োগযোগ্য কিছু হবে। এটি হলে তো আর কাওয়াম হওয়া হচ্ছে না; হচ্ছে অত্যাচারী জমিদারের মতো স্বেচ্ছাচারী হওয়া মাত্র—এতে অন্যে সমর্থন লাভ করে না, বরং পরাভূত হয়। ন্যায়ের জন্য মজবুতভাবে দাঁড়ানোর অর্থ তো ন্যায়ের উপর কর্তাগিরি বা মাতব্বরি ফলানো নয়। একই কথা নারীর বেলাতেও প্রযোজ্য। মানুষের উপর থেকে মানুষের কর্তৃত্বের অবসানই আল্লাহর ধর্মের প্রধানতম উদ্দেশ্য এবং সকলের কর্তব্য-পরিচয় যথাযথভাবে প্রকাশ করাই নবীদের কাজ। পুরুষদের সমভাবে মানুষ হিসেবে নারীদের বিকাশ, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মনির্ধারণ, সম্মান, ক্ষমতায়ন, প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদির জন্য নারীদের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোর কথাই যুক্তিসঙ্গত ও কোরানের সামগ্রিক শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কথা হতে পারে।

৮.৭। কাওয়ামুন বনাম কুনু কাওয়ামিন

আল্লাহ ন্যায়ের ক্ষেত্রে আবেদন করেছেন ‘কুনু কাওয়ামিনা’ (ন্যায়ের পক্ষে দণ্ডায়মান হও) বলে। কিন্তু নারীর বেলায় আহ্বান বা আবেদনের সিনটেক্স অনুসৃত হয়নি। এর ব্যাখ্যা কী? মনে করুন জামাল কর্তৃক সেলিম ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে। জামালের বাহাদুরির ভিত্তি তার ক্ষমতা ও বিত্ত। এখন জামালের কাছে আবেদন করা যায়: হে বাহাদুর! সেলিমের সমর্থনে ক্ষমতা ও বিত্ত নিয়ে দাঁড়াও। আবার এভাবেও বলা যায়: বাহাদুর সে, যে অন্যের সমর্থনে ক্ষমতা ও বিত্ত নিয়ে দাঁড়ায়। এই পরের বাক্যটি এরূপ পরিস্থিতিতে বেশী জোরালো স্টেটমেন্ট। এতে জামালের প্রতি আবেদন যেমন করা হচ্ছে, তেমনই নিজ অবস্থানের পক্ষে অহংকারপ্রসূত তার নিজের যুক্তিকেই তার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে—যাকে বলা যায় ‘টার্ন দি টেবিল ওভার’। নবীপূর্বের অজ্ঞতার যুগে পুরুষের যে অবস্থান ছিল, যে যুক্তি ছিল, পরবর্তী কালে কোরানের শব্দের ভ্রান্ত ও অবৈধ অর্থ নির্ধারণ করে টেবিলটি আরও একবার ঘুরিয়ে দেয়া হলো (২x১৮০) এবং মুসলিম সমাজকে অজ্ঞতার যুগে ফিরিয়ে নেয়া হলো।

৮.৮। Protector বনাম Stand Out Firmly

৮.৮.১। কাওয়ামুনা শব্দের মূল অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি দৃঢ়তার সাথে দণ্ডায়মান। এরূপ ব্যক্তিকে রক্ষক, প্রটেক্টর, মেইনটেইনারও বলা যায়। এ অর্থ ভাবগত বা ফলিত দিক থেকে সঠিক। যৌক্তিকভাবে ডিরাইভড এই অর্থ কোন কোন বচনে সমস্যা তৈরি না-ও করতে পারে। নারীর বেলায় এইরূপ শব্দ ব্যবহারের সবচে বিপদজনক ও ধ্বংসাত্মক দিক হচ্ছে পূর্বসংস্কার ও ধারণার অনুষঙ্গ জাত ভ্রষ্টতা।

৮.৮.২। ন্যায়ের ধারণাটি নিয়ে কথা বলা যাক। ন্যায় বা জাস্টিস এর একটি স্বতঃ বা নিজস্ব কাঠামো (ইনট্রিনসিক স্ট্রাকচার) রয়েছে। আমরা বাইরে থেকে ন্যায়ের কাঠামো তৈরি করি না। ন্যায়ের প্রটেক্টর, মেইনটেইনার বা কাস্টোডিয়ান হও বললে আমরা এটা বুঝি না যে, আমরা বাইরে থেকে ন্যায়ের কাঠামো তৈরি করবো অথবা আমরা আমাদের বিবেচনামতো ন্যায়কে চালনা করব। আমরা ন্যায়ের উপর কর্তৃত্ব করি না। বরং আমরা বুঝি যে, যা ন্যায় তা-ই ন্যায় এবং সেই ন্যায়কে আমরা সংরক্ষণ করবো। কিন্তু পুরুষতন্ত্রের প্রভাবেই হোক, বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে লালিত-পালিত হওয়া থেকে জাত পূর্বসংস্কার বা প্রেজুডিসের বশেই হোক, নারীর বেলায় এই একই শব্দাবলী ব্যবহার করলে তাদের উপর আমরা অন্যায় অর্থ আরোপ করতে থাকি, বাক্যে যা বলা হয়নি সেসব ধারণাবলীর দিকে দ্রুত ধাবিত হতে থাকি—পরবর্তী ধারণামালা গঠনে, অনুষঙ্গে এবং অনুসিদ্ধান্তে যাওয়ার ক্ষেত্রে বা যাওয়ার মাধ্যমে। পুরুষ নারীর প্রটেক্টর, গার্ডিয়ান বা মেইনটেইনার বললে চট করে এই ধারণা বলবান হয়ে উঠে যে, নারীর ভবিষ্যৎ বা নারীর কাঠামো নারী নিজে ঠিক করবে না—পুরুষ তাকে গড়বে, চালাবে। এখানে নারী নিষ্ক্রিয়, ব্যক্তিত্বহীন, স্বাধীনতাহীন এবং পুরুষের আনুগত্য করাই যেন তার দায়িত্ব।

৮.৮.৩। কাঠামোর নিজস্বতার দিক থেকে বিবেচনা করলে, ন্যায়ের ধারণা থেকে নারীর সত্তাগত পার্থক্যটি বিরাট। নারী চিন্তাশীল মানুষ, প্রতিজন নারী স্বতন্ত্র ব্যক্তি। ব্যক্তিনারী ও নারীসমাজের অবস্থা ও পুরুষের সাথে সম্পর্ক একটি ক্রমোন্নতিশীল, ক্রমবিকাশমান প্রসেস যেখানে নারী নিজে অংশ গ্রহণ করে এবং চিন্তায় ও কর্মে সক্রিয় হতে পারে।

৮.৯। কর্তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার

৮.৯.১। কে কার উপর কর্তৃত্ব করবে, মানবসমাজের কোন অংশ অন্য কোন অংশের উপর কর্তৃত্ব করবে তা ঠিক করে দেয়ার জন্য আল্লাহ রসুল পাঠান না; পাঠান দায়িত্ব/কর্তব্য সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করার জন্য। আল্লাহ নবীদেরকে মানুষের উপর, পিতামাতাদেরকে সন্তানদের উপর, শিক্ষকদেরকে ছাত্রদের উপর, সরকারকে জনগণের উপর কর্তা নিযুক্ত করেননি। আল্লাহ বলেছেন উল্টোভাবে—আল্লাহর আনুগত্য কর; আল্লাহ, নবী ও জনগণ কর্তৃক বা আইনানুগভাবে নিয়োজিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে অনুসরণ কর; পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাক; কর্তব্যপরায়ণ হও; ইত্যাদি। পুরুষ বা স্বামী এমন কী বিশিষ্ট হয়ে উঠলো যে—নিয়ম ভেঙ্গে—তাদেরকে নারীদের উপর কর্তা পদে নিয়োগ দিতে হবে আল্লাহকে? “হে নারীরা/স্ত্রীরা, তোমরা পুরুষদের/স্বামীদের অনুসরণ কর” অথবা “হে নারীরা/স্ত্রীরা, তোমরা পুরুষদের/স্বামীদের প্রতি কৃতজ্ঞ হও”—এমন শর্তহীন আহ্বান বা আদেশ কোরানে পাওয়া যায় না। পুরুষ হওয়া কী কোন সৌভাগ্য, আর নারী হওয়া কী কোন দুর্ভাগ্য যে নারীর স্রষ্টাকে নারীকে বলতে হবে, “শোন নারী! পুরুষ তোমার কর্তা?!!!”

৮.৯.২। ‘কর্তা’ অভিধাযুক্ত শব্দ সহযোগে ‘কাওয়াম’য়ের অর্থ করা কালে কালে পরিত্যক্ত হচ্ছে। নতুন নতুন অনুবাদে প্রটেক্টর/মেইনটেইনার অর্থটি গৃহীত হচ্ছে, এমনকি রক্ষণশীলরাও এই দিকে আসছেন। কেন? কারণ কাওয়াম শব্দের অর্থ কর্তা বা অথরিটি নয়। তাছাড়া, কোন জ্ঞানী মুসলিমের পক্ষে এটি বলা সম্ভব নয় যে, পুত্র মায়ের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী। মাতা-পুত্রের সাবসেটে যেহেতু কর্তৃত্ব অকার্যকর বা অবৈধ হয়, সেহেতু নারী-পুরুষের পূর্ণ সেটে তা আর বৈধ থাকে না। আর রক্ষক, নিরাপত্তাবিধায়ক জাতীয় শব্দগুলো পরিহার করা ভাল এদের সাথে যুক্ত পুরুষতান্ত্রিক অনুষঙ্গমূলক ধারণাগুলোর কারণে। কাজেই ‘পুরুষ তারা, যারা নারীর সমর্থনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়’ জাতীয় অনুবাদ অনেকটাই নিরাপদ এবং মূল আরবির নিকটবর্তী। এই সমর্থনে দাঁড়ানোর অর্থ কন্যা-পিতা, মাতা-পুত্র, স্ত্রী-স্বামী, বোন-ভাই সহ যেকোনো নারী ও যেকোনো পুরুষের বেলাতেই প্রয়োগযোগ্য থাকে।

৮.১০। আগের পর্বে যেমন বলা হয়েছে, রিজাল শব্দটি সক্ষম ব্যক্তিমানুষকেও—যা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ— বুঝায় (এটি নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করতে চেষ্টা করব)। অগ্রসর, সক্ষম, প্রতিষ্ঠিত নারীরাও রিজালের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে ‘আররিজালু কাওয়ামুনা আলান্নিসা’ অর্থ প্রসারিত হয়ে দাঁড়ায়: সক্ষম ব্যক্তিরা—পুরুষ হোক, নারী হোক—নারীর সমর্থনে দাঁড়ায়। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই নারীবাদ কোরানে বিধৃত আদর্শের একটি অন্যতম উপাদান। আল্লাহ নারীবাদী, কোরান নারীবাদী, নবীও নারীবাদী। নবীর স্ত্রীরাও ছিলেন নারীবাদী। নবীর নারী সাহাবিদের মধ্যেও ছিলেন নারীবাদীরা।

নারীর কোরান – ৭ (লাহুন্না ও সুবর্ণবিধি)

৭.১। কোরানে উল্লেখিত ২:২২৮ আয়াতের ‘লাহুন্না মিসলুল্লাযি’ বচনটি কোরানের নারীনীতিমূলক বচনসমূহের অন্যতম। এটি মূলত সুবর্ণ বিধির একটি বিশেষ প্রকাশ, যা আবার কোরানের অন্য নীতিগুলোর সাথে মিলে একটি ব্যাপক ও পরিপূর্ণ নীতি গঠন করতে পারে। আমরা গসপেলে যীশু প্রমুখাত পেয়েছি: ‘অন্যের সাথে সেরূপ আচরণ কর, যেরূপ আচরণ তুমি অন্যের নিকট থেকে প্রত্যাশা করে থাক’। কিন্তু এখানে একটি অচলাবস্থা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে বিধি অনুসারীর সংখ্যা কম, সেখানে এর অনুসারীদেরকেই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে হয়, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি সমাজ যদি উন্নত হয় ও বিধি অনুসারী দিয়ে সমাজ পূর্ণ থাকে তবে এই অচলাবস্থা নিরসনের নীতির প্রয়োজন হয়। এটিকে বলা যায় টাই-ব্রেকিং প্রিন্সিপল।

৭.২। বিধিটি আমার জন্য যেমন পালনীয়, তেমনই আপনার জন্যও; এবং মনে করুন আমরা দুজনেই বিধি মেনে চলতে সম্মত হলাম। মনে করুন, একটি টেবিল ঠেলে সরানো দরকার। আমি আপনার কাছে প্রত্যাশা করছি আপনি টেবিলটি ঠেলে সরিয়ে দিন। এই প্রত্যাশা আমার উপর এই দায়িত্ব আরোপিত করে যে, আমিই টেবিলটি ঠেলবো। আবার আমার নিকট আপনার প্রত্যাশাও আপনাকে আমার মতো অবস্থায় উপনীত করে। অর্থাৎ, আমার নিকট আপনার প্রত্যাশামতো আপনার দায়িত্ব হয় টেবিলটি ঠেলা। কাজেই আপনার ও আমার উভয়েরই সমান কর্তব্য হলো এবং এতে করে পরস্পরের নিকট সমান অধিকারও হলো।

৭.৩। এখন প্রশ্ন হতে পারে কে আগে পদক্ষেপ নেবে? আমি আমার অধিকারকে বড় করে দেখলে অপেক্ষার পলিসি নিতে পারি। আপনিও পারেন একইরূপ চিন্তা করতে। এভাবে উভয়ে অপেক্ষা করলে টেবিলটি কোনদিনই সরবে না। যদি টেবিলটিকে সত্যি সরাতে হয় তবে কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে একটি প্রতিযোগিতার নীতি প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ উভয়ের জন্য ‘কে আগে টেবিল ঠেলতে পারে’ ধরণের নীতি। যদি আমরা উভয়েই কর্তব্যপরায়ন হই, নিজের অধিকার নিয়ে চিন্তিত না হই, তবে আপনি আমাকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেবেন না, এবং আমিও চাইবো আপনার আগেই টেবিলের কাছে চলে আসতে। কাজেই এই সদর্থক অবস্থাতেও প্রতিযোগিতা একটি নীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কোরানের ২:১৪৮ ও ৫:৪৮ আয়াতে আল্লাহ এই নীতিটি লিখে দিয়েছেন: ‘ভালর জন্য প্রতিযোগিতা কর’।

৭.৪। দ্বিতীয় একটি কেইস আছে। মনে করুন, আপনি তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন; আর আমি আছি সুবিধাজনক অবস্থায়। আপনি প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সমরূপ গ্রাউন্ডে বিরাজ করছেন না। এখন কে আগে এগিয়ে আসবে? বিধিটি নিজেও তা ব্যাখ্যা করতে পারে। আমি যেহেতু প্রত্যাশা করি যে, আমার অসুবিধার কথা অন্যে বিবেচনা করুক, সেহেতু আপনার অসুবিধার কথা আমার বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু যদি গভীরভাবে লক্ষ করেন, তবে দেখতে পাবেন এটি একজনকে কর্তব্য পরিহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোন পরিস্থিতিতে কর্তব্য থেকে অব্যাহতি লাভের সিদ্ধান্ত সাধারণত কর্তব্যপরায়ণ নিজে সহজে নিতে চায় না। এজন্য স্পষ্ট অব্যাহতির বা অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। কাজেই এই এরূপ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা জনের উপর স্পষ্টভাবে অগ্রভূমিকা আরোপ করতে হয়। এই ২:২২৮ আয়াতটিতে আমরা সক্ষমদের জন্য অগ্রভূমিকার বাধ্যতা পাই। এতে অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকা জনের দায়িত্বভার হ্রাস পায়।

৭.৫। কোরানে আরেকটি নীতির উল্লেখ আছে ২৩:৯৬ ও ৪১:৩৪ আয়াতে; যা হচ্ছে: ‘ভাল নিয়ে মন্দের সম্মুখীন হও’ নীতি। যদিও এর অর্থ অনেক ব্যাপক তবুও এখানে এর প্রয়োগ সম্ভব। এই নীতি অনুসারে যে টেবিল ঠেলতে অগ্রসর হতে বিলম্ব করে তাকে অনুসরণ না করে ও তার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে নিজেই অগ্রসর হও, এবং যতবার এমন ঘটে ততবারই অগ্রসর হও। কাজেই প্রতিযোগিতার বিধি, অগ্রভূমিকার বিধি ও ভাল নিয়ে মন্দের সম্মুখীন হওয়ার বিধি সুবর্ণ বিধিকে পূর্ণতা দেয়। গসপেলেও এই কথা ভিন্ন ভাষায় বর্ণীত হয়েছে: যে তোমার ক্ষতি করে, তুমি তার উপকার করো মর্মের নানা বচন রয়েছে।

৭.৬। বর্তমান ‘লাহুন্না’ নীতিটি এই দ্বিতীয় কেইসের। এই নীতি নারী ও পুরুষের জন্য সমরূপ অধিকার নির্ধারণ করেছে, পুরুষদের উপর অগ্রভূমিকা অর্পণ করেছে এবং নারীদের ভারকে হ্রাস করেছে। বাংলা ট্রান্সলিটারেশন, আরবি ও শব্দগত ইংরেজি অনুবাদ নীচে দেওয়া হলো।

লাহুন্না মিস্‌লুল্লাযি আলায়হিন্না বিল্‌মারুফ, ওয়া লির্‌রিজালি আলায়হিন্না দরাজাত।

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ

ওয়া (and) লাহুন্না (for them) মিস্‌লুল্লাযি (like of that) আলায়হিন্না (on them) বিল্‌মারুফ (as reasonable/known), ওয়া (and) লির্‌রিজালি (for men) আলায়হিন্না (on them) দরাজাত (precedence)।

And for them is equitable to what is expected of them, according to what is reasonable. And for men is the precedence over what is expected of them।

৭.৬.১। সহি ইন্টারন্যাশনাল আলায়হিন্না এর অর্থ করেছে ‘what is expected of them’ হিসেবে। প্রথম ‘আলায়হিন্না’ যা বুঝায় দ্বিতীয় ‘আলায়হিন্না’ তা-ই নির্দেশ করে বুঝলে অর্থ আরও পরিষ্কার হয়।

৭.৬.২। মারুফ শব্দের মূল অর্থ ‘সুবিদিত’। এর থেকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ অর্থেও উপনীত হওয়া যায়, কারণ যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাছে সুবিদিত, তা যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত। আচরণের ক্ষেত্রে তা-ই আবার শিষ্টাচার সম্মত হবে। একারণে মারুফ শব্দের অর্থ সাধারণত ন্যায়্যসঙ্গত, শিষ্টাচারসম্মত, সুন্দর, সুবিদিত ইত্যাদি করা হয়ে থাকে। কাজেই নারীর প্রাপ্য নির্ধারিত হচ্ছে তার কাছে প্রত্যাশার সমরূপভাবে, যেখানে সমপরিমাণটি নির্ধারিত হচ্ছে সুবিদিত, যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত ভাবে এবং তা প্রদেয় হচ্ছে শিষ্টাচারসম্মত, সুন্দর ভাবে।

৭.৬.৩। ‘তাদের’ শব্দটি দ্বারা জেন্ডার নির্ধারণ করা যায় না বিধায় আমরা নারীবাচক সর্বনামের স্থলে ‘নারীদের’ পদটি ব্যবহার করে স্পষ্টতা আনতে পারি। তাহলে নীতিটি বাংলায় এভাবে লেখা যায়: ‘নারীদের জন্য তার সমরূপ, যা নারীদের উপর—ন্যায়সঙ্গতভাবে; এবং পুরুষদের জন্য, যা নারীদের উপর তদ্‌বিষয়ে অগ্রভূমিকা।’

৭.৬.৪। এখানে আলোচনা হচ্ছে নারীর অধিকার, স্বার্থ, তার প্রতি কর্তব্য নিয়ে—মর্যাদার বিষয়টি এখানে অনুপস্থিত। প্রথমে যা বলা হচ্ছে তার ফলিত বা চূড়ান্ত তাৎপর্য অধিকারের সমতা, কর্তব্যভারের সমতা—যা অনুবাদকরা অস্বীকার করেননি। এই অবস্থায় হুট করে মর্যাদায় আধিক্য বুঝতে হলে একটি অহেতুক ও অবৈধ অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়। অবৈধ একারণে যে, পুরুষের জন্য মর্যাদায় আধিক্যের কথায় উপনীত হলে সমতার পূর্ব নীতিটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাছাড়া, স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ইসলাম ধর্মে একটি পূর্বস্বীকৃত নীতি—কারণ নারী-পুরুষের উৎস এক (কোরান ৪:১), এবং আল্লাহর বিচারে উভয়ের চূড়ান্ত অর্জিতব্য মর্যাদা কাজের ভিত্তিতে নির্ধারিতব্য (কোরান ৪৯:১৩)।

৭.৬.৫। নবীর সাহাবি ইবন আব্বাস কোরানের এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর সামনে নিজেকে সজ্জিত অবস্থায় উপস্থাপন করে থাকি, যেহেতু আমিও চাই যে, তিনিও তা করুন; এবং তিনি এই প্রসঙ্গে এই আয়াতটি উল্লেখ করেন। ইবন কাসিরের তফসিরে পাওয়া এই বর্ণনা কোরানের এই আয়াতের যথার্থ ব্যাখ্যা।

৭.৭.১। এই নীতিটি মূলত রেসিপ্রোসিটির নীতি। বিধিটি আবার নিজেও রেসিপ্রোকাল। সেমতে প্রথম অংশের জন্য বলা যায়: পুরুষের নিকট নারী যেরূপ প্রত্যাশা করবে, নারীর নিকট থেকে পুরুষেরও সেরূপ প্রাপ্য হবে। কিন্তু অগ্রভূমিকা নিয়ে তিন রকম কথা বলা যায়: ১. পুরুষ সক্ষম হলে, নারী সক্ষম বা অক্ষম উভয় অবস্থায় পুরুষের জন্য অগ্রভূমিকা নির্ধারণ করতে পারে। ২. নারী যদি সক্ষম হয়, তবে নিজ ইচ্ছায় অগ্রভূমিকা নিজের জন্য নির্ধারণ করতে পারে, ৩. পুরুষ যদি অক্ষম হয়, তবে সক্ষম নারীর জন্য অগ্রভূমিকা বাধ্যতামূলক হতে পারে। সক্ষমতার প্রশ্ন আসে কোরানের আরেকটি নীতি থেকে; যা হচ্ছে: ‘কর্তব্য সামর্থ্যের অতিরিক্ত হবে না’।

৭.৭.২। কোরানের কোন অনুজ্ঞা বা নির্দেশনা প্রসঙ্গ অনুসারে যদি কেবল পুরুষ বা কেবল নারীর জন্য নির্ধারিত হয়, তবে তার বিপ্রতীপটিও সঠিক হয়—পুরুষের কর্তব্যভারে আধিক্য ও কর্তব্য সম্পাদনে পদক্ষেপে অগ্রভূমিকা সহ। পুরুষের এই অতিরিক্ত ভার কিন্তু আবার নারীর প্রতি পুরুষের দান নয়, এটি নারীর প্রাপ্য হয় নারীর গর্ভ ধারণে সক্ষমতা ও গর্ভধারণের কষ্টের বিপরীতে। আল্লাহ নিজেই এর জন্য নারীকে নির্বাচন করেছেন, সক্ষমতা দান করেছেন। এখানে নারীর উপর ভার অর্পিত হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে, যা থেকে নারী নিজেকে মুক্ত করতে পারে না; কিন্তু পুরুষের পক্ষে কর্তব্যে অবহেলা করা সম্ভব বিধায় ভারটি আইনগত ও নৈতিক; এবং একারণে এটিকে কর্তব্যে আধিক্য হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়।

৭.৮। মুসলিম আইনবেত্তারা সাধারণত দায়িত্বের বা কর্তব্যের অপরিহার্যতা নির্ধারণ করতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কার উপর দায়িত্ব অর্পিত হলে উপযুক্ত কারণ ব্যতীত সে সেই দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃত হতে পারবে না। যেমন, যুদ্ধ করা সক্ষম পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক থাকে। কিন্তু সক্ষম পুরুষের সংখ্যা কোন যুদ্ধে যথেষ্ট হিসেবে বিবেচিত না হলে, সক্ষম নারীরা প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ করবে। এ অবস্থায় নারীরা বলতে পারবে না যে, তারা যুদ্ধে যাবে না। মুসলিম আইনবেত্তাদের মধ্যে এই অভিমতও রয়েছে যে, কোন সমাবেশে যদি উপস্থিত পুরুষদের কেউ নামাজ লীড করতে না জানে কিন্তু সেখানে কোন সক্ষম নারী বর্তমান থাকে, তবে সেই নারীই নামাজ লীড করবে। এরকম অবস্থায় নারী দায়িত্ব পরিহার করতে পারবে না। বা বলতে পারবেন না যে, তিনি ইমামতি করবেন না।

৭:৯। কোরানের নারী নীতি হচ্ছে এরকম: নারীকে অগ্রসর করে আনার জন্য পুরুষরা সহায়ক হয়ে পাশে দাঁড়াবে ও কাজ করবে; নারীরা উদ্যোগী হবে এবং নিজেদেরকে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করবে, এবং তারা নিজেদের বিবেচনা অনুসারে অগ্রসরমান হবে। পুরুষরা তাদের উপর তাদের অনিচ্ছায় ভার চাপাতে পারবে না, আবার নারীদের নিজ সিদ্ধান্তে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদেরকে বাধা দেবে না। সক্ষম নারীরাও পুরুষরা অক্ষম হয়ে উঠলে সহযোগিতা করতে পিছপা হবে না।

৭.১০। রাজুল (রিজাল-এর একবচন) শব্দটির অর্থে ব্যাপকতা রয়েছে। রাজুল দ্বারা প্রধানত লিঙ্গগত পুরুষ বুঝায়; তেমনই এর মধ্যে রয়েছে সক্ষম পুরুষের দ্যোতনা; সর্বোপরি, রাজুল বলতে ব্যক্তি, সক্ষম ব্যক্তি, বলিষ্ঠ ব্যক্তিও বুঝায়—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমরা যদি দুই ভাই-বোনকে একে অপরের সাথে মন্দ আচরণ করতে দেখি, এবং ভাইটি যদি প্রতিবন্ধী হয় বা বোনটি স্পষ্টতই অনেক সবল অবস্থানে থাকে, তবে বোনটিকে আগে সংশোধনের উপদেশ দিতে পারি। এই ক্ষেত্রে বোনটিই রিজালদের অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হয়। রিজাল শব্দটি কোরানের নানা স্থানে কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিয়ে আমরা পরের একটি পর্বে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

৭.১১। এই ব্যাপক পরিসরে ‘মিস্‌লুল্লাযি’ বা সমরূপতার নীতিকে আমরা একটি সাধারণ নীতিতে রূপান্তরিত করতে পারি: ‘অন্যের প্রাপ্য হবে তার নিকট প্রত্যাশার সমরূপ, এবং সক্ষমতা বা শক্তি বা সুবিধার অধিকারীর জন্য রয়েছে অগ্রভূমিকা।’

নারীর কোরান – ৬ (দারাজাত)

৬.১। কোরানের দ্বিতীয় সুরা বাকারা’র ২২৮ আয়াতের একটি বাক্য সার্বিকভাবে পুরুষের নিকট নারীর অধিকার নির্ধারণ করেছে। প্রাথমিক ধারণার উদ্দেশ্যে, এই আয়াতাংশের অনুবাদ দেয়া গেল: And due to them is equitable to what is expected of them, according to what is reasonable. And for men is the precedence over what is expected of them। এই অনুবাদ কোরানের আরবির খুবই কাছাকাছি। এই আয়াতে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সমরূপ বা ইকুইটেবল অধিকারের বিষয়টি বেশীর ভাগ ইংরেজি অনুবাদকই লিখেছেন। তবে সমস্যা বেঁধেছে এই আয়াতে ‘দারাজাত’—যা সাধারণত ইংরেজিতে ‘degree’ বা ‘precedence’ শব্দ দিয়ে অনুবাদ করা হয়—তার প্রকৃত বা ফলিত অর্থ নিয়ে। কিন্তু বাংলা অনুবাদকেরা এখানে ‘শ্রেষ্ঠত্ব’, ‘মর্যাদা’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেছেন কিসের ভিত্তিতে—তা শক্তভাবে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

৬.২। নাস্‌তাদ্‌রিজু

৬.২.১। কোরানের ৭:১৮২ এবং ৬৮:৪৪ আয়াতে ‘সা-নাস্‌তাদ্‌রিজু-হুম’ (‘we will lead them degree by dergee’) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ‘নাস্‌তাদ্‌রিজু’ শব্দটি ক্রিয়াপদ, যার মধ্যে ‘দারাজাত’ শব্দটি রয়েছে। ৭:১৮২ আয়াতের কয়েকটি অনুবাদ নীচে দেয়া গেল:

Sahih International — But those who deny Our signs—We will progressively lead them [to destruction] from where they do not know.

Pickthall — And those who deny Our revelations—step by step We lead them on from whence they know not.

Dariabandi — And those who belie Our signs, step by step We lead them on in a way they know not.

৬.২.২। এই উভয় আয়াতে ‘নাস্‌তাদ্‌রিজু’ এর জন্য ইংরেজিতে ‘progressively lead’, ‘lead step by step’, ‘gradually lead’ ইত্যাদি ফ্রেইজ যেমন ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনই বাংলা অনুবাদেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ‘ক্রমে ক্রমে’, ‘ধীরে ধীরে’, ‘পর্যায়ক্রমে’, ‘ক্রমান্বয়ে’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

৬.৩। দারাজাত

এছাড়াও বিবেচ্য ২:২২৮ আয়াতসহ আরও আঠারটি স্থানে দারাজাত শব্দটি পাওয়া যায়: ৩:১৬৩, ৬:১৩২, ৮:৪, ৪৬:১৯, ২:২৫৩, ৪:৯৬, ৬:৮৩, ৬:১৬৫, ১২:৭৬, ১৭:২১, ৪৩:৩২, ৫৮:১১, ৪:৯৫, ৯:২০, ৫৭:১০, ২০:৭৫ ও ৪০:১৫। এইসব আয়াতে দারাজাত শব্দের অর্থ করা হয়েছে: ‘degrees’, ‘varying gradess’, ‘ranks’ ইত্যাদি। এখানে তুলনার বিষয়াদিতে নান আয়াতে নানা বৈচিত্র্য রয়েছে—যা সাধারণভাবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, অর্জন, কর্মফল, প্রাধিকার ইত্যাদি। বাংলায় এসব ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে ‘শ্রেষ্ঠত্ব’, ‘মর্যাদা’ ইত্যাদির অবৈধ ছড়াছড়ি দেখা যায়।

৬.৪। ক্রম বা ডিগ্রী

দারাজাত শব্দের মধ্যে ডিগ্রী, ক্রম, স্তর ইত্যাদি অভিধা রয়েছে এবং এই ক্রমের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দ্যোতনাও রয়েছে—কালগত, স্থানগত বা অবস্থাগত বিচারে এই ক্রম বা ডিগ্রী। দারাজাত শব্দের অর্থ অবধারিতভাবে মর্যাদায় আধিক্য বা শ্রেষ্ঠত্বকে বুঝায় না। এই স্তরভেদ যেমন সদর্থক হতে পারে, তেমনই হতে পারে নঞর্থক; ভাল অর্থে যেমন, তেমনই মন্দ অর্থেও হতে পারে। আল্লাহর বিচারে ভাল কাজে লিপ্তদের মধ্যে যেমন একের তুলনায় অপরের দারাজাত আছে, তেমনই মন্দ কাজে লিপ্তদেরও দারাজাতে পার্থক্য আছে। ডিগ্রী বা ক্রম শব্দ নিজে থেকে কিছু বলতে পারে না; কার সাথে কার তুলনা হচ্ছে কিসের ভিত্তিতে—এটিও জানা দরকার হয়। তাপমাত্রায় ডিগ্রী আছে, শিক্ষাগত অর্জনে (এচিভমেন্ট) ডিগ্রী আছে, আছে খেলায় র‍্যাংকিং। কিন্তু দারাজাতে ফারাক আমাদেরকে মর্যাদায় ফারাক করার অধিকার আবশ্যিকভাবে দেয় না।

৬.৫। নারীর বিপরীতে পুরুষের জন্য দারাজাত

৬.৫.১। বর্তমান আয়াতে বলা হয়েছে যে, নারীর বিপরীতে পুরুষের জন্য ‘দারাজাত’ বা ডিগ্রী বা ক্রম রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দারাজাতটি বা ক্রম-গত অগ্রসর অবস্থানটি কোন বিষয়ে? এটি আয়াতের আলোচিত বিষয় বা কন্টেক্সটের উপর নির্ভরশীল ও সেখান থেকে প্রাপ্তব্য। আলোচনা হচ্ছে পুরুষের নিকট নারীর অধিকার নিয়ে, নারীর প্রতি পুরুষের কর্তব্য নিয়ে। এখানে অধিকার প্রদানে বা কর্তব্য সাধনে পদক্ষেপগত ক্রম, অথবা, প্রদেয় অধিকারে বা সাধিতব্য কর্তব্যে পরিমাণগত আধিক্য ইত্যাদি বিষয়েই দারাজাত। নারীর জন্য পুরুষের সমান অধিকারের, বা সমান কর্তব্যভারের কথা বলা হলে উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য সমান হয়। এখন কে কর্তব্য পালনে প্রথম পদক্ষেপ নেবে? এবিষয়ে কার দায় আইনগতভাবে বা নৈতিকভাবে বেশী? এগুলোই বিবেচ্য প্রশ্ন। উভয়েই অপরকে শর্ত দিলে, অপরের অগ্রভূমিকার জন্য অপেক্ষার নীতি অবলম্বন করলে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

৬.৫.২। এই আয়াতের ‘লির্‌রিজালি আলায়হিন্না দারাজাত’ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে ‘পুরুষের জন্য রয়েছে তাদের (নারীদের) বিপরীতে অগ্রভূমিকা’। অর্থাৎ নারীর নিকট থেকে পুরুষের প্রত্যাশা নারীকে সেই প্রত্যাশার সমরূপ অধিকার দেবে, বা সেই প্রত্যাশার সমরূপ কর্তব্য পুরুষের উপর অর্পিত হবে। এবং নারীর অধিকার প্রদানে বা পুরুষের কর্তব্য পালনে পুরুষকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। অর্থাৎ, পুরুষ নারীর পদক্ষেপের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারবে না, নারীর উপর শর্ত আরোপ করতে পারবে না যে, তুমি তোমার দায়িত্ব আগে পালন করো, তাহলে তোমার প্রাপ্য পাবে। কিন্তু নারীর বেলায় অবস্থাটি বিপরীত: অর্থাৎ, নারী শর্ত দিলে, পুরুষের অগ্রভূমিকা দাবী করলে, অপেক্ষার নীতি অবলম্বন করলে, পুরুষ তার দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হলে তবে তাকে অনুসরণ করবো বলে বসলে, পুরুষকে নিজের দিকে আগে তাকাতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নারী চাইলেও অগ্রভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে না। বিষয়টি নারীর বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল—পুরুষের মীমাংসা বা কর্তৃত্বের উপর নয়।

৬.৫.৩। এখানে নারী-পুরুষের বেলায় পুরুষের জন্য আগে অগ্রসর হওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নারীর কাছে ভাল আচরণ প্রত্যাশা করা হলে, পুরুষের নিকট থেকে ভাল আচরণ নারীর প্রাপ্য হবে। পুরুষ নিজে ভাল আচরণ ক’রে তারপরে নারীর কাছ থেকে সমরূপ ভাল আচরণ প্রত্যাশা করতে পারবে। একারণে, কোন ভাইয়ের মন্দ আচরণের বিপরীতে তার বোন মন্দ আচরণ করলে অথবা বোনের মন্দ আচরণের বিপরীতে ভাই সমরূপ প্রতিক্রিয়া করলে আমরা সেই বোনটিকে কিছু বলতে পারি না। এবং কোরানের এই নীতি অনুসারে ভাইটিকেই আগে সংশোধিত হওয়ার উপদেশ দিতে হয়; একইসাথে বোনটির উপর কোন শর্ত আরোপ না করেই তাকে তার ভাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের জন্য কর্তব্য হয়। এরূপ কথা কন্যা-পিতা, স্ত্রী-স্বামী, মাতা-পুত্র সহ যেকোনো নারী ও যেকোনো পুরুষের বেলাতেই প্রযোজ্য। এই নীতিটি কিভাবে সুরা নিসা’র ৩৪ আয়াতে প্রযুক্ত হয়েছে তা আমরা পরে দেখার চেষ্টা করব। সেখানকার সঙ্গতি আবার বর্তমান আয়াতের এই ব্যাখ্যাকে যুক্তিসিদ্ধ করবে।

৬.৬। আয়াতাংশের বিভিন্ন অনুবাদ

৬.৬.১। এখন দেখা যাক, নীতিবচনটি কে কিভাবে অনুবাদ করেছেন।

Sahih International — And due to the wives is similar to what is expected of them, according to what is reasonable. But the men have a degree over them [in responsibility and authority].

Shehnaz — And they (wives) have rights similar to those (of husbands) over them in a reasonable manner, and men have a degree over them (wives).

Pickthall — And they (women) have rights similar to those (of men) over them in kindness, and men are a degree above them.

Yusuf Ali — And women shall have rights similar to the rights against them, according to what is equitable; but men have a degree (of advantage) over them.

Shakir — And they have rights similar to those against them in a just manner, and the men are a degree above them.

Muhammad Sarwar — Women have benefits as well as responsibilities. Men have a status above women.

Mohsin Khan — And they (women) have rights (over their husbands as regards living expenses, etc.) similar (to those of their husbands) over them (as regards obedience and respect, etc.) to what is reasonable, but men have a degree (of responsibility) over them.

Arberry — Women have such honourable rights as obligations, but their men have a degree above them.

Dariabandi — Unto women is due likes that which is due from women reputably. And for men is a degree over them.

Muhammad Asad — The rights of the wives [with regard to their husbands] are equal to the [husbands'] rights with regard to them, although men have precedence over them [in this respect].

Muhammad Ali — And women have rights similar to those against them in a just manner, and men are a degree above them.

ইবন কাসিরের তফসিরের অনুবাদ — আর নারীদের উপর তাদের যেরূপ স্বত্ব আছে, নারীদেরও তদনুরূপ ন্যায়সঙ্গত স্বত্ব আছে; এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।

মউদুদির তাফহিমুল কোরানের অনুবাদ — নারীদের জন্যও ঠিক তেমনই ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন পুরুষদের অধিকার আছে তাদের উপর। তবে পুরুষদের তাদের উপর একটি মর্যাদা আছে।

কুতুবের ফি যিলালিল কোরানের অনুবাদ — পুরুষদের উপর নারীদের যেমন ন্যায়ানুগ অধিকার রয়েছে, তেমনই রয়েছে নারীদের উপর পুরুষের অধিকার, (পারিবারিক ভরণ পোষণের দায়িত্বের কারণে) তাদের উপর পুরুষের মর্যাদা এক মাত্রা বেশী রয়েছে।

মুহম্মদ শফীর মাআরেফুল কোরানের অনুবাদ — আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনই ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ — নারীদের তেমনই ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে।

৬.৬.২। অধিকাংশ ইংরেজি অনুবাদকই এখানে ‘দারাজাত’ বুঝাতে ‘ডিগ্রী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মহসিন খানের মতো কনসারভেটিভ আবার ‘স্ট্যাটাস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে মুহম্মদ আসাদ ব্যবহার করেছেন ‘প্রিসিডেন্স’ শব্দটি। তবে অনেকেই ব্র্যাকেটের মধ্যে তিনি যা বুঝেছেন সেরকমভাবে ডিগ্রীর বিষয়টি উল্লেখ করে দিয়েছেন। সহিহ ইন্টারন্যাশনাল-এ বন্ধনীর মধ্যে ‘রেসপন্সিবিলিটি’র সাথে ‘অথরিটি’ও যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ইউসুফ আলী ডিগ্রীর পরে বন্ধনীর মধ্যে ‘অব এডভান্টেজ’ জুড়ে দিয়েছেন—পূর্ণ বচনের মধ্যে যার কোন সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া ভার। কেউ লাহুন্না/আলায়হিন্না এর মধ্যে স্ত্রীবাচক যে সর্বনামটি আছে তা বুঝতে গিয়ে ‘স্ত্রীদের’ বুঝেছেন, কেউ বুঝেছেন ‘নারীদের’। কেউ কেউ এই আয়াতের আলোচ্য বিষয় তালাকের মধ্যেই সীমিত থেকেছেন।

৬.৬.৩। তবে বেশির ভাগই এটিকে দেখেছেন বৃহত্তর সেট ‘নারী’ সম্বন্ধীয় সাধারণ নীতি হিসেবে—যা যথার্থ: কারণ তালাক সংক্রান্তে আগে ‘তাদের স্বামীদের’ (বুঈউলাতুহুন্না) ব্যবহৃত হলেও পরে এই বাক্যে ‘পুরুষদের জন্য’ (লির্‌রিজালি) ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে পুরুষ বলতে স্বামীকে এবং কেবল স্বামীকে বুঝালে আকস্মিকভাবে ‘রিজাল’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়তো না। শব্দ নির্বাচনে কোরানে প্রিসিশন লক্ষণীয়; কাজেই এখানে ‘পুরুষ’ বলতে ‘স্বামী’ বুঝলে নিজেদের অনুমানকে আল্লাহর কথার উপর আরোপের অভিযোগ উঠতে পারে। এখানে বিশেষ নির্দেশনা থেকে ক্রমে সাধারণ নীতি উপস্থাপনার দিকে ভাষা অগ্রসর হয়েছে। এখানে সবচে দুঃখজনক ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে মহসিন খান ও সরওয়ারের। আর বাংলা অনুবাদগুলো তো চিরকালের পুরুষাধিপত্যকে ভালভাবে ‘কোরানসম্মত’ করেছে।

৬.৭। প্রকাশ্য ভ্রান্ত ও অত্যাচারী নীতি

৬.৭.১। ‘নারীর উপর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা মর্যাদা রয়েছে’—নীতিটি যে কত ভ্রান্ত তা কেবল একটি উদাহরণ দিলেই বুঝা যায়। আমাদের কেউই একথা বলতে পারবেন না যে, মাতা অপেক্ষা পুত্র বেশী মর্যাদার বা শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। মাতা-পুত্রের সাবসেটে নীতিটি স্পষ্টতই ভেঙ্গে পরে। কাজেই নারী-পুরুষের পূর্ণ সেটে নীতিটি অবৈধ হয়ে উঠে। সাধারণত পুরুষতন্ত্রের পোষকরা বিষয়টি সার্বিকভাবে দেখার কথা বলে থাকেন—যেন আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেন খুবই শিথিল ভাবে। কিন্তু কর্তব্য কর্মে পুরুষের জন্য অগ্রভূমিকার বাধ্যতা নারী-পুরুষের পূর্ণ সেট’য়ের জন্য প্রয়োগযোগ্য থাকে, যেখানে কোন সাবসেটেই তা ভেঙ্গে পরে না। এই নীতি কন্যা-পিতা, স্ত্রী-স্বামী, মাতা-পুত্র, বোন-ভাই সহ যেকোনো নারী ও যেকোনো পুরুষের বেলাতেই সঠিকতা বজায় রাখে।

৬.৭.২। আল্লাহ কোরানের কোথাও বলেননি যে, ‘মালিকরা মর্যাদায় দাসদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’, ‘জমিদারেরা মর্যাদায় কৃষকদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’, ‘পুঁজিপতিরা মর্যাদায় শ্রমিকদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’, ‘আমলারা মর্যাদায় কামলাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’, ‘শাসকেরা মর্যাদায় শাসিতদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’, বা ‘সাদারা মর্যাদায় কালোদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’। আর পুরুষ এমন কী পুঙ্গব হয়ে উঠলো যে, আল্লাহ নবী পাঠিয়ে ঠিক করে দেবেন যে, পুরুষরা নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? আল্লাহ মানুষের কর্তব্য ঠিক করে দেয়ার জন্য নবীদের পাঠান। তিনি চান আধিপত্যকামী ও শক্তি প্রদর্শনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে; সমাজের দুর্বল করে রাখা অংশকে ক্রমান্বয়ে সমরূপে সবল করে তুলতে, এই অংশের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করতে।

নারীর কোরান – ৫ (নারী)

৫.১। আরবি ভাষায় লিঙ্গ মাত্র দুটি: পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ। মানুষের উৎপত্তি এবং জগতে মানুষের অবস্থান ও মানুষের প্রকৃতি নিয়ে কথাগুলোতে শব্দের লিঙ্গে নানা প্রকার শিফটিং আমরা দেখতে পাই। কোথাও ‘সঙ্গী’ পুরুষ-বাচক ও কোথাও স্ত্রী-বাচক। আল্লাহ যখন ‘হে মানবজাতি’ বা ‘হে বিশ্বাসীরা’ বলে সম্বোধন করেন বা ‘তোমরা’ সর্বনাম ব্যবহার করেন, তখন তার মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে।

৫.২। আমরা আগের দুই পর্বে নারী-পুরুষের অস্তিত্বের উৎসগত ঐক্য (নাফসিন ওয়াহিদাতিন) এবং জগতে তাদের মর্যাদা ও অবস্থানের (আদম) দিক থেকে সমরূপতা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। নারী-পুরুষের এই সমরূপতাকে আল্লাহ প্রকাশ করেছেন অন্য আরও দুটি আয়াতে।

২:১৮৭ আয়াতে বলা হয়েছে: হুন্না লিবাসুল্লাকুম, ওয়া আন্‌তুম লিবাসুল্লাহুন্না। অর্থাৎ: তোমরা তাদের পরিচ্ছদ এবং তারা তোমাদের পরিচ্ছদ।

৭:৭১ আয়াতে বলা হয়েছে: আল মু’মিনুনা ওয়াল মু’মিনাতি বায়্‌দুহুম আউলিয়াউ বায়্‌দিন। অর্থাৎ: বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা পরস্পরের বন্ধু।

৫.৪। আল্লাহ পুরুষ ও নারী উভয়কে জীবনে সফলতার ক্ষেত্রে সমরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আল্লাহর উপর আস্থা রেখে, পুরুষ হোক বা নারী, যে-ই সৎ ও ন্যায়ানুগ কাজে নিরত থাকবে, তারাই প্রবেশ করবে কাননে এবং তারা অণুপরিমাণেও প্রতারিত হবে না। (কোরান ৪:১২৪)

৫.৩। নৈতিক গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে এমন কোন গুণ-বৈশিষ্ট্যের নজীর কোরানে নেই যা আল্লাহ পুরুষকে অর্জন করতে বলেছেন, কিন্তু নারীকে বর্জন করতে বলেছেন। এমন কোন গুণ নেই যা পুরুষের জন্য অবাঞ্ছিত হয়েছে, কিন্তু নারীর জন্য বাঞ্ছিত হয়েছে। এমন কোন দোষ নেই যা পুরুষের জন্য কম নিন্দনীয়, কিন্তু নারীর জন্য বেশী নিন্দনীয়। ৩৩:৩৫ আয়াতে বিস্তারিত বলা হয়েছে নিম্নরূপভাবে।

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণকারী পুরুষ ও আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণকারী নারী, আল্লাহর উপর আস্থাশীল পুরুষ ও আল্লাহর উপর আস্থাশীল নারী, কর্তব্যনিষ্ঠ পুরুষ ও কর্তব্যনিষ্ঠ নারী, সত্যনিষ্ঠ পুরুষ ও সত্যনিষ্ঠ নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সংযমী পুরুষ ও সংযমী নারী, গোপনীয় অঙ্গ সংরক্ষণকারী পুরুষ ও গোপনীয় অঙ্গ সংরক্ষণকারী নারী, আল্লাহকে স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে স্মরণকারী নারী—তাদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও বিপুল প্রতিদান।” (কোরান ৩৩:৩৫)

৫.৫। কিন্তু অহংকারী ও প্রাধান্যকামী পুরুষ মনস্তত্ত্বকে আল্লাহ আক্রমণ করেছেন নিচের দুটি আয়াতে।

“When any of them is given a good news regarding female, his face is darkened; and he is a repressor. He hides himself from community because of the evil of the glad tiding which he has received. Shall he keep this in humiliation or shall he bury it in the dust? Ah, evil indeed is whatever they decide!” (Koran 16:58-59)

“And when any of them is given a good news regarding that he has refered to the All-Compassionate in analogy, his face is darkened; and he is a repressor. What is he then! – he is one who is brought up with ornaments alone and he is one who is not lucide in arguments.” (Koran 43:17)

৫.৫.১। প্রথমটিতে আল্লাহ সাধারণভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক পৌরুষ-অভিমানী মনোভাবের চিত্র এঁকেছেন। কন্যা সন্তানের জন্মসংবাদ থেকে শুরু হয় এই বৈষম্যকামী মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া—তার মুখ কালো হয়ে যায়, সে তার অন্তরে অন্তরে মর্মজ্বালায় ভুগতে থাকে, যা সে গোপন করতে সচেষ্ট হয়ে উঠে। এই মানসিকতা নারীদের শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতা, স্বাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে সকল পদক্ষেপের বিরোধিতা পর্যন্ত করতে শুরু করে প্রকাশ্যে ও গোপনে।

৫.৫.২। দ্বিতীয় আয়াতে এই মনোভাবকেই মমতাবান আল্লাহ নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে প্রকাশ করেছেন। আরবি ভাষায় গর্ভ (রেহেম) ও মমতা (রাহমা)—এই শব্দ দুটি একই মূল থেকে এসেছে। সনাতন আরবরা ফেরেশতাদেরকে নারী হিসেবে গণ্য করতো এবং আল্লাহর সন্তান বলে মনে করতো। আমারাও নারী ও মমতা শব্দ দুটিকে খুবই নিকট সম্পর্কে আবদ্ধ শব্দযুগল বলে জানি। ভাষাগত দিক থেকে এবং/বা—এমনকি—বিশ্বাসের দিক থেকে, গর্ভের অধিকারী নারীকে মমতাময় ও করুণাময় আল্লাহর গুণের সাথে যারা নিকট সম্পর্কে আবদ্ধ করেছে, তারাই আবার নারীকে অবদমিত করতে উদ্যত হয়, কোরানের মৌলিক নীতিকে ধ্বংস করে নিজেদের জন্য অধিকতর মর্যাদা দাবী করে বসে।

৫.৬। বিচার দিবসের চিত্র আঁকতে গিয়েও আল্লাহ নারীকে এনেছেন এভাবে।

“When the female, buried alive, is questioned—
For what crime she was killed.”
(Koran 81:8-9)

মানবজাতির ইতিহাসে বৈরিতা, শোষণ ও অত্যাচারে দাস-মালিক, কৃষক-জমিদার, শ্রমিক-পুঁজিপতি, জনগণ-রাষ্ট্র ইত্যাদি নানা যুগল থাকলেও আল্লাহ নারী-পুরুষ যুগল থেকে নারীকেই বেছে নিয়েছেন চিত্রটি আঁকতে গিয়ে। নারীকে অবদমিত রাখা, তাকে অধীন করে রাখা, তার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বকে অস্বীকার করা, তার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলা—এই সবই নারীকে শিশু করে রাখা, সেই শিশুকে মাটির নীচে প্রোথিত করে ফেলা এবং তাকে হত্যা করার নামান্তর। নারীর অধিবাস যেন জীবন্ত কবরবাস। নারী যখন ধর্ষিত হয়, এই মানসিক অবস্থা তখন বলে নারীর চলন বাঁকা; ‘চলন সোজা’ নারীর বেলায় বলে নারী চলতে গেল কেন; যখন ঘরের ভেতর অত্যাচারটি ঘটে তখন আর কী বলার বাকি থাকে এছাড়া যে, নারী মাটির নীচে গেল না কেন!

৫.৮। নারীর কাছে মানুষের ঋণের কথা আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এই আয়াতে: “We have enjoined on man kindness to his parents: In pain did his mother bear him, and in pain did she give him birth.” (Koran 46:15)। মানুষের এই ঋণ নারীকে দিয়েছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এবং গর্ভসমূহ সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে তিনি এই সচেতনতাকে তাঁর সম্বন্ধে সচেতনতার সাথে যুক্ত করেছেন এভাবে: “O mankind! Be careful of your duty to your Lord Who created you from a single soul and from it created her mate and from them twain hath spread abroad a multitude of men and women. Be careful of your duty toward Allah in Whom ye claim your rights of one another, and toward the wombs. Lo! Allah hath been a watcher over you.” (Koran 4:1)।

নারীর কোরান – ৪ (আদম)

৪.১। সাধারণত ধারণা করা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে প্রথম নারী এবং পরে এই জোড়া থেকে সমস্ত নরনারী। ‘আদম-হাওয়া’র এই ব্যাখ্যা আমরা শৈশবেই জেনে থাকি। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে এই যে, কোরানের কয়েক স্থানে ‘আদম’ নামটির উল্লেখ পাওয়া গেলেও কোথাও ‘ইভ’ বা ‘হাওয়া’ নামটি নেই। তার স্থানে বলা হয়েছে ‘আদমের সঙ্গী’। নারী ও পুরুষের মধ্যে কে আগে বাস্তবে মূর্ত হয়েছিল তা কোরান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ‘ইভ’ বা ‘হাওয়া’ নামটি সমগ্র কোরানে ব্যবহৃত না হওয়ার মধ্যে একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে বলেই মনে হয়।

৪.২। আগের পর্বে আমরা দেখেছি যে, নারী-পুরুষের জেন্ডার বিভাজনের ক্ষেত্রে উৎস হিসেবে ‘নাফস’ শব্দটি প্রত্যেকবার ব্যবহার করা হয়েছে। এই ‘নাফস’ স্ত্রীবাচক শব্দ হলেও ‘আদম’ পুরুষের নাম হিসেবে আমরা জানি। ‘নাফস’য়ের বেলায় সঙ্গী পুরুষবাচক, এবং ‘আদম’য়ের বেলায় সঙ্গী স্ত্রীবাচক শব্দ রূপে এসেছে। যখন মানবজাতির নারী-পুরুষ—এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের উৎস নিয়ে কথা বলা হয়েছে তখন কোরানে ‘পুরুষ’ বা ‘আদম’ শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। এর মধ্যেও গভীর তাৎপর্য নিহিত আছে ধারণা করা যায়।

৪.৩। ‘আদম’য়ের কাহিনী নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে কোরানের ২:৩০-৩৯, ৭:১০-২৫, ১৭:৬১-৬৫, ১৮:৫০ ও ২০:১১৫-১২৩ আয়াতে। তার জ্ঞান, জগতে তার অবস্থান ও মর্যাদা, পতন, অনুশোচনা, ক্ষমা লাভ ইত্যাদি আয়াতসমূহের আলোচিত বিষয়। কোরানের নানা স্থানে ‘আদম’ নামটি এসেছে পঁচিশবার; এর মধ্যে ‘বনি আদামা’ বা ‘আদম সন্তান’ বা ‘চিলড্রেন অব এডাম’ সাতবার (৭:২৬, ২৭, ৩১, ৩৫, ১৭২, ১৭:৭০ ও ৩৬:৬০); ‘জুররিয়াতি আদামা’ বা ‘আদমের অফস্প্রিং’ (১৯:৫৮) একবার। তিনটি আয়াতে আদমের সঙ্গিনীর কথা এসেছে (২:৩৫, ৭:১৯, ২০:১১৭)। আদমের দুই পুত্রের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ৫:২৭-৩১ আয়াতে; তবে হাবিল ও কাবিলের নাম (এবেল ও কায়েন) সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তাছাড়া ৩:৩৩ ও ৩:৫৯ আয়াতে আদম নামটি নুহ, ইব্রাহিম, ইমরান, যিশু ইত্যাদি নামের সাথেও এসেছে।

৪.৪। আমরা আগের পর্বে বলেছিলাম যে, মানুষ ইন্টারনালি নারী-পুরুষে বিভক্ত ও পরস্পরের পরিপূরক, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে সকলে একরূপ। সতর্কতার সাথে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, যেখানে জগতে মানুষের অবস্থান, মর্যাদা, জ্ঞানগত সামর্থ্য, নৈতিক দুর্বলতা, পতন, অনুতাপ, মানুষের চৈতন্যগত সক্ষমতা ও তার মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ সম্বন্ধে কিছু বলা হয়েছে সেখানে ‘আদম’ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে। সঙ্গিনীর কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে জগতে বসবাস ও অশুভের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সংগ্রামের ক্ষেত্রে—যেখানে সঙ্গীর উল্লেখ তাৎপর্যপূর্ণ হয়।

৪.৫। আদমের কাহিনীগুলো রূপকধর্মী বা এলেগরিক্যাল। ‘আদম’কে সার্বিক ধারণা (‘মানুষ’) বা মূল ব্লুপ্রিন্ট (‘নাফস’) এর নাম হিসেবে দেখলে প্রতিটি নারী-পুরুষই আদমের অন্তর্ভুক্ত। পুরুষের বেলায় বলা যায় আদম পুরুষ ও নারী তার সঙ্গী এবং নারীর বেলায় আদম নারী ও পুরুষ তার সঙ্গী। পুরুষ যেমন আল্লাহর প্রতিনিধি, তেমনই নারীও এবং পুরুষ যেমন ভাষাগত ও গাণিতিক প্রতীকের মাধ্যমে বিবরণ তৈরির সামর্থ্যের অধিকারী, তেমনই নারীও। পুরুষের প্রতি যেমন ফেরেশতারা নত ও শয়তান দ্রোহী, তেমনই নারীদের বেলায়ও।

৪.৬। কোরানের কয়েক স্থানে ফেরেশতাদেরকে আদমের প্রতি নত হওয়ার বিষয়টি লিখিত আছে (২:৩৪, ১৭:৬১, ১৮:৫০, ২০:১১৬)। আবার ৭:১০-১১ আয়াতে আমরা দেখি মানবজাতিকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বহুবচনে ‘তোমাদের’ সর্বনাম ব্যবহার করে প্রথমে বলছেন সৃষ্টি ও রূপদানের কথা এবং তারপর আসছে আদমের প্রতি নত হবার নির্দেশটি। এখানে জগতে মানুষের বাস্তব সৃজন ও রূপায়নের সাথে বর্ণিত হয়েছে রূপকধর্মী ‘আদমের প্রতি ফেরেশতাদের নতি ও ইবলিসের প্রত্যাখ্যান’কে।

(7:10) And We have given you power in the earth, and appointed for you therein livelihoods. Little give ye thanks! (7:11) And We created you, then fashioned you, then told the angels: Fall ye prostrate before Adam! And they fell prostrate, all save Iblis, who was not of those who make prostration.

৪.৭। ‘প্রকৃতি’র বা জগতের বিপরীতে মানুষ হচ্ছে ‘পুরুষ’। এই পুরুষকার লিঙ্গগত পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়—লিঙ্গগত নারীও মানুষ হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে এর অধিকারী। মানুষ হচ্ছে সেই সত্ত্বা যা লিঙ্গগতভাবে ইন্টারনালী নারী-পুরুষে বিভক্ত, যেখানে নারী ও পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক। এই বিভাজন প্রজননে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে, কোন অযৌন বিষয়ে বা ক্ষেত্রে এই বিভাজনের কোন অর্থ নেই। আমরা জগতে প্রতিষ্ঠাকে পুরুষবাচক গুণ বলতে পারি ও নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টিতে সক্ষমতাকে নারীবাচক গুণ হিসেবে দেখতে পারি। প্রথম গুণের বিচারে প্রতিটি নারীর মধ্যে পুরুষধর্ম রয়েছে এবং একইভাবে দ্বিতীয় গুণের বিচারে প্রতিটি পুরুষের মধ্যে নারীধর্ম রয়েছে।

৪.৮। প্রসঙ্গত বলা যায়, কোরানে আদমের ভ্রান্তি ও পতনের জন্য তার সঙ্গীকে (বা নারীকে বা হাওয়া’কে) দোষী করা হয়নি। আদমের ভ্রান্তিকে কোথাও আদমের এবং কোথাও উভয়ের ভ্রান্তিকে উভয়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সঙ্গীর প্ররোচনায় আদম পতিত হয়েছে—এই কথা কোন ইঙ্গিতেও কোরানে উল্লেখিত হয়নি, যদিও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, হাওয়ার প্ররোচনায় আদম ভ্রষ্ট হয়েছিল।

৪.৯। আমরা কোরানের কোথাও ‘নারী অবলা’, ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’ ইত্যাকার কোন কথা পাই না। পুরুষের গায়ে শক্তি বেশী হতে পারে; আবার নারীও গর্ভধারণের সামর্থ্য সম্পন্ন, যেক্ষেত্রে পুরুষ অক্ষম। কোরানে এমন কোন নৈতিক গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ নেই যা পুরুষের জন্য প্রশংসনীয় কিন্তু নারীর জন্য অনভিপ্রেত বা নারীর জন্য প্রশংসনীয় কিন্তু পুরুষের জন্য অনভিপ্রেত। লজ্জাশীলতা পুরুষের জন্যও অভিপ্রেত গুণ, আবার দৃঢ়তা নারীর জন্যও।

৪.১০। আমরা যদি ধরেও নেই যে, ‘আদম’ ও ‘নাফস’ সমার্থক তবুও অতীতের ভাষ্যকারদের প্রচলিত মতের আসল দাবীটি স্ববিরোধী। তাদের মতে আদম থেকে হাওয়া সৃষ্ট হয়েছে ও তাই আদমের মর্যাদা হাওয়ার চেয়ে বেশী। যদি উৎস অপেক্ষা উৎপন্নের মর্যাদা কম হয়ে থাকে তবে মাটি থেকে উৎপন্ন আদম মর্যাদার অধিকারী হয় কিভাবে? মাটি থেকে উৎপন্ন আদমের মর্যাদা মাটি থেকে বেশী হলো, কিন্তু আদম থেকে উৎপন্ন হয়ে হাওয়ার মর্যাদা আদম থেকে কম কেন হলো তার কোন ব্যাখ্যা তাদের কাছে পাওয়া যাবে কী? আবার একই পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া থেকে জন্ম নেয়া পুরুষ ও নারী সন্তানদের মধ্যে মর্যাদায় ফারাক কী করে সম্ভব তারও কোন উপযুক্ত ব্যাখ্যা তাদের কাছে নেই। আদম পুরুষ বলে তার পুরুষ সন্তানের মর্যাদা বেশী কী করে হয় যদিও তাদের মায়ের মর্যাদা কম এবং নারী সন্তানদের বেলায় কী করে মর্যাদা কম হয় কেবল এই কারণে যে, তারা তাদের কম মর্যাদার মায়ের সন্তান, যদিও তাদের পিতা আদম?

নারীর কোরান – ৩ (নাফসিন ওয়াহিদাতিন)

৩.১। প্রতীয়মান এই বস্তুর জগতে কিভাবে মানুষ এসেছে সেই প্রক্রিয়াটির কোন বিস্তারিত বিবরণ আমরা কোরানে পাই না। আমরা যা পাই তা হলো কনসেপচুয়াল ডেসক্রিপশন। কিন্তু এই ডেসক্রিপশন অনুসারে বাস্তবে মানুষ কিভাবে এসেছে বা এই ডেসক্রিপশন কিভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে তা বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। অথবা বিজ্ঞানীরা যা জানতে পারবেন তার সাথে এই ডেসক্রিপশন মেলে কিনা তা আমাদের পরীক্ষার বিষয় হতে পারে। তবে কোরানের ডেসক্রিপশন খুবই ফ্ল্যাক্সিবল বিধায় নানা রকম প্রকল্প সম্ভব।

৩.২। লিঙ্গ ও জাতি নির্বিশেষে সকল ব্যক্তিমানুষের সমমর্যাদা ও সম-অধিকারের নীতিটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আল্লাহ কোরানে মানুষ সৃষ্টি সম্বন্ধে নিম্নরূপভাবে কথা বলেছেন।

(30:20) And of His signs is, that he created you of dust, then lo! ye are human beings spreading yourselves. (30:21) And of His signs is, that he created for you from yourselves pouses that ye may dwell in tranquillity with them, and He set between you affection and compassion. Verily herein are signs for a people who reflect.

(49:13) O mankind verily We! We have created you from male and female, and We have made you nations and tribes that ye might know one another. Verily the noblest of you with God is the most righteous of you; verily God is Knowing, Aware.

৩.৩। উপরের ৩০:২১ আয়াতে আল্লাহ বহুবচন ব্যবহার করে ‘তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী’ সৃষ্টির কথা বলেছেন। এই ‘তোমাদের’ মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়েই বিদ্যমান। এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমাদের মধ্য থেকেই পুরুষ ও তার সঙ্গী নারী এবং নারী ও তার সঙ্গী পুরুষ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে নারীর উপর পুরুষের প্রাধান্য ও মর্যাদা এবং বিপরীতক্রমে পুরুষের উপর নারীর প্রাধান্য ও মর্যাদা দাবীর কোন সুযোগ কোন পক্ষই পাচ্ছে না। ৪৯:১৩ আয়াতে আল্লাহ নারী-পুরুষ ও জাতি-গোত্র ভিত্তিক অবস্থানের কারণে কারও দ্বারা অন্যের চেয়ে বেশী মর্যাদার দাবী অস্বীকৃত হয়েছে। এখানে আল্লাহ মানবজাতিকে সম্বোধন করে কথা বলছেন, নারী ও পুরুষ উভয়ই যার অন্তর্ভুক্ত। মানুষে মানুষে মর্যাদার কোন ফারাক হতে পারে কেবল আল্লাহর বিচারে এবং তিনি তা করেন মানুষের নৈতিক জীবনে উৎকর্ষতার ভিত্তিতে। মানুষ এই বিচারের সামর্থ্যও রাখে না, এখতিয়ারও রাখে না, এবং তার ভিত্তিতে ফারাক করারও প্রশ্নও আসে না।

৩.৪। মানুষের উৎপত্তির উৎসের একত্বের কথা কোরানের বলা হয়েছে ৪:১, ৭:১৮৯ ও ৬:৯৮ আয়াতে। মানবজাতি তথা সকল ব্যক্তিমানুষ—সকল নারী-পুরুষ—একটি মাত্র ‘নাফস’ বা আত্মা বা সত্তা থেকে এসেছে। প্রথম দুটি আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, সেই সত্তাটি থেকেই এসেছে তার সঙ্গী।

(4:1) O mankind! Be careful of your duty to your Sustainer Who created you from a single soul and from her created her mate and from them twain has spread abroad a multitude of men and women. Be careful of your duty toward God in Whom ye claim (your rights) of one another, and toward the wombs. Lo! God is an Observer over you.

(7:189) He it is who created you from a single soul, and from her made her mate that he might find tranquility in her. Then when he covers her, she carries a light burden and continues therein, then when she groweth heavy the twain call upon God their Sustainer: If You should give us a good, we will surely be among the grateful.

(6:98) And He it is Who has raised you up from a single soul, and (has given you) a habitation and a repository. We have detailed Our signs for a people who have understanding.

৩.৫। এখানে ‘নাস’ (মানবজাতি), ‘নাফসিন ওয়াহিদাতিন’ (একটি মাত্র সত্তা), ‘মিনহা’ (তা থেকে) ও ‘যাউজাহা’ (তার সঙ্গী) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে শব্দের জেন্ডার। ‘রাব্বাকুম’, ‘খালাকাকুম’ এর ‘কুম’ পুরুষবাচক সর্বনাম যা পুরুষবাচক ‘নাস’কে নির্দেশ করে। আবার ‘নাফস’ একটি স্ত্রীবাচক শব্দ। ‘মিনহা’ এর ‘হা’ স্ত্রীবাচক সর্বনাম, যা স্ত্রীবাচক ‘নাফস’কে নির্দেশ করে। কিন্তু তারপরের ‘যাউজাহা’ এর ‘যাউজা’ (সঙ্গী) পুরুষবাচক এবং ‘হা’ স্ত্রীবাচক সর্বনাম যা নির্দেশ করছে স্ত্রীবাচক ‘নাফস’কে।

৩.৬। ‘নাফস’ হচ্ছে অহং। কিন্তু এখানে অহং বা আত্মা বা আত্মসচেতন সত্তার অর্থ কী হতে পারে, যা থেকে মানবজাতির উন্মেষ হয়েছে? এখানে ‘নাফস’কে একটি লজিক্যাল ছাঁচ বা প্যাটার্ন বলা সম্ভব; প্রোগ্রামের সাথেও তা তুল্য; এটিকে মূল ব্লুপ্রিন্টও বলা যায়।

৩.৭। জেন্ডার নিরপেক্ষভাবে কথার অগ্রগমনটা এরকম: হে মানুষ (নারী+পুরুষ), আমরা তোমাদেরকে (নারী+পুরুষ) একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছি এবং সেই সত্তা থেকেই তোমাদের (নারী+পুরুষ) সঙ্গী (নারীর জন্য পুরুষ + পুরুষের জন্য নারী) সৃষ্টি করেছি। নারী ও পুরুষকে দুটি সাবসেট ধরে মানুষকে একটি সেট বলা যায় যা পূর্বোক্ত সাবসেট দুটোর সমন্বয়ে গঠিত। জেন্ডার ভিত্তিক ভাবে এখন কথাটিকে এভাবে বলা সম্ভব: হে পুরুষজাতি, আল্লাহ তোমাদেরকে ও তোমাদের সঙ্গীস্বরূপ নারীদেরকে একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন; এবং এভাবেও বলা যায়: হে নারীজাতি, আল্লাহ তোমাদেরকে ও তোমাদের সঙ্গীস্বরূপ পুরুষদেরকে একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন।

৩.৮। আমরা যদি মানুষ ও নারীকে দুটি প্লেটোনিক ইউনিভার্সাল আইডিয়া হিসেবে দেখি তবে বলা যায়, মানুষ অস্তিত্বে আসে নারী থেকে। মানবজাতির লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন এবং মানুষকে অস্তিত্বে আনার ক্ষেত্রে প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ—এই উভয় দিক থেকে নারী ও পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক; এবং একই সাথে স্বতন্ত্র ব্যক্তিমানুষ হিসেবে উভয়েই একরূপ।

৩.৮.১। আল্লাহ সুরা নিসার শুরুতে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা ও সম-অধিকারের ভিত্তি হিসেবে একই সত্ত্বা থেকে মানবজাতির উৎপত্তি ও একই যুগল থেকে সকল নারী-পুরুষের উৎপত্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি এমন একটি কথা যা গর্বিত পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভঙ্গির মূলে আঘাত করে। শুধু তাই নয় এর পর আল্লাহ আরও বলেছেন যে, আল্লাহ সম্বন্ধে সচেতন থাক এবং গর্ভসমূহ সম্বন্ধে। পুরুষরা আল্লাহর দোহাই দিয়েই এযাবৎকাল নারীকে অপমান ও তুচ্ছজ্ঞান করে এসেছে এবং করে চলেছে। তারা তাদের আধিপত্যের অধিকারকে আল্লাহর দোহাই দিয়েই প্রতিষ্ঠিত করে এসেছে। তাদের কাছে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ও আছে ঔরস; নারীকে তারা সন্তান উৎপাদনের জীবন্ত যন্ত্র হিসেবে দেখেছে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন গর্ভের কথা, এবং এই নতুন ভঙ্গিকে অবলম্বন করে তাঁর সম্বন্ধে নতুনভাবে সচেতন/সাবধান হতে ও থাকতে।

৩.৯। লক্ষণীয় বিষয়

কোরানে মানবজাতির উৎপত্তির উৎসটিকে ‘নাফসিন ওয়াহিদাতিন’ (একটি মাত্র নাফস) বলা হয়েছে। তিন তিনটি আয়াতে এই বিষয়ে কথা বলা হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘নাফসিন ওয়াহিদাতিন’ বলা হয়েছে। কোরানের কোথাও এই বিষয়ে ‘পুরুষ’ বা ‘আদম’ শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। ‘মানুষকে একটি মাত্র পুরুষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ও তা থেকে নারীকে (বা সঙ্গীকে) সৃষ্টি করা হয়েছে’ অথবা ‘মানুষকে আদম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ও তা থেকে ঈভকে (বা সঙ্গীকে) সৃষ্টি করা হয়েছে’—এই কথা কোরানের কোথাও পাওয়া যায় না। ‘পুরুষ’ বা ‘আদম’ এর বদলে তিনটি আয়াতেই ‘নাফস’ শব্দটি ব্যবহারের কারণে পুরুষের পক্ষে জেন্ডার ভিত্তিক প্রাধান্য দাবীর কোন সুযোগ হচ্ছে না।

৩:১০। নীচে ৪:১, ৭:১৮৯ ও ৬:৯৮—এই তিনটি আয়াতে মানবজাতির উৎস সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা পাশাপাশি ছকাকারে দেয়া হলো। এখানে ‘খালাকা’, ‘আনশাআ’, ‘জাআলা’ শব্দগত ভ্যারিয়েশন থাকলেও ‘নাফসিন ওয়াহিদাতিন’-এ কোন ভ্যারিয়েশন নেই। তার নীচে ৪:১ আয়াতে বর্ণিত ডেস্ক্রিপশনটির (O mankind!… created you from a single soul and from her created her mate and from them twain has spread abroad a multitude of men and women) একটি ইলাস্ট্রেশন দেয়া হল।



নারীর কোরান – ২ (পরিবার)

২.১। এই পর্বে আমরা পরিবারের সম্ভাব্য বিকল্প সব কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবো। পরিবারকে যদি একটি সংগঠন হতে হয় তবে তা হয় মাতা শাসিত হবে, নয়তো হবে পিতা শাসিত। কারণ কোন সংগঠনে একজনকে বিরোধ নিষ্পত্তিকারীর ভূমিকায় থাকতে হয়। আমরা উভয় ক্ষেত্রে পরিবারের প্রাকৃতিক রূপ কী হতে পারে তা নির্ধারণের চেষ্টা করবো। প্রাকৃতিক সংগঠন বলতে আমরা বুঝবো এমন সংগঠন যা নিয়ন্ত্রণের জন্য চিন্তাপ্রসূত বা নৈতিক নিয়ম একান্তভাবে আবশ্যক না হলে গ্রহণ করা হবে না। পরিবারের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক আবশ্যকতা বলতে বুঝবো সন্তান উৎপাদন, তাদের প্রতিপালন ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য যা আবশ্যক তা।

২.২। প্রাকৃতিক মাতা-শাসিত পরিবার

এরূপ পরিবার গড়ে উঠবে মায়ের নেতৃত্বে ও মাকে কেন্দ্র করে। এখানে মা পরিবারের প্রধান ও তার সন্তানরা সেই পরিবারের অন্যান্য সদস্য। মা এই পরিবারে নিষ্পত্তিকারী। মায়ের কন্যার সন্তানেরা এই পরিবারেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। মায়ের/নানীর মৃত্যুর পর কন্যাদেরকে কেন্দ্র করে পরিবার বিভক্ত হবে। মা, মায়ের সন্তানরা ও মায়ের কন্যাদের সন্তানরা পরিবার রক্ষার কাজ করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মা বা তার কন্যারা সন্তান নেবে কিভাবে? ব্রিডিংয়ে পুরুষরা কিভাবে অংশ নেবে? এখানে দুটি বিকল্প হতে পারে।

২.২.১। বিবাহবর্জিত মাতা-শাসিত পরিবার

যখন কোন নারী সঙ্গ চাইবে তখন সে অন্য পরিবারের পুরুষকে আহ্বান করবে, যেহেতু পুরুষকে দীর্ঘ সময় অবস্থানের প্রয়োজন পড়ে না। পুরুষ এরূপ আহ্বানে সাড়া দিতে পারে, যেহেতু তার সন্তান মাতার আশ্রয়ে নিরাপদ, যেহেতু এতে পুরুষের জন্য বহুগামিতার সুযোগ থেকে যায়, যেহেতু পুরুষের অংশ গ্রহণ সম্পন্ন হলেও সন্তান সাথে সাথেই অস্তিত্বে আসে না বিধায় সন্তানের সাথে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। একারণেই যে পুরুষেরা যায় তারা এত সহজেই পতিতালয়ে যেতে পারে, তারপর খুশিমনে দূরে সরে যেতে পারে, সম্ভাব্য সন্তানের জন্য তার না থাকে কোন চিন্তা, না থাকে দুঃখ। ক্রুড ন্যাচারাল মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে বিবাহ বা চুক্তির কোন প্রয়োজন নেই এবং যৌনাচারে কোন নিয়ন্ত্রণ বা শর্ত আরোপের প্রয়োজন নেই।

পুরুষ তার মায়ের পরিবারে বসবাস করবে ও বৃদ্ধকালে বোন, বোনের কন্যা বা ভাইয়ের কন্যার আশ্রয়ে থাকবে। এখানে পুরুষরা অন্য পরিবারের জন্য ব্রিডার, ও নিজ পরিবারের জন্য শ্রমদাতা। ভাই-বোনেরা নীতিগতভাবে পরস্পরের অর্ধ-ভাই ও অর্ধ-বোন। কারণ তারা কেউ নিশ্চিত নয় কে কার বাবা। এই ধরনের সমাজে নারীর গর্ভ সংরক্ষণ অর্থহীন; ফলে পুরুষ কোন শঙ্কা নিয়ে বাস করবে না।

২.২.২। বিবাহযুক্ত মাতা-শাসিত পরিবার

নারীরা তাদের কাছে অন্য পরিবারের পুরুষকে এনে রাখবে সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য ও সহায়তার জন্য ও পুরুষ সম্মত হবে তার সন্তানের সান্নিধ্যে থাকার ও তাদের জন্য কাজ করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে এবং এক্ষেত্রে নারীকে গর্ভ সংরক্ষণ করতে হবে (অন্য পুরুষের কাছে সে যাবে না)। যদি স্বামী অন্য নারীর নিকট যায় তবে স্ত্রী তার বিরুদ্ধে তার পরিবারে অন্যের সন্তান নিয়ে আসছে—এমন অভিযোগ তুলতে পারছে না, পারবে চুক্তিভঙ্গ ও তার প্রাপ্য সান্নিধ্য থেকে তাকে বঞ্চিত করার অভিযোগ করতে। স্বামীকে সে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে পারে, না ফিরলে চুক্তি বাতিল করতে অর্থাৎ বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে।

যদি স্বামী গর্ভ সংরক্ষণের অঙ্গিকার থেকে স্ত্রীর সরে যাওয়ার আশঙ্কা করে তবে সে স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার কোলে অন্যের সন্তান তুলে দেয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করতে পারে, যা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এবং সেই সাথে চুক্তিভঙ্গ ও সান্নিধ্যে বঞ্চনার অভিযোগ তো থাকছেই। এ ক্ষেত্রে তাকে স্ত্রীর অধীনে থেকে তার বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী শক্ত অভিযোগ আনতে হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে অত্যাচারটি বড়, অথচ তা উত্থাপন করতে হচ্ছে সে যার অধীন তার বিরুদ্ধে। সন্তুষ্ট না হলে স্বামী চুক্তি ভেঙ্গে দিয়ে চলে যেতে পারে, এবং তার সান্নিধ্য কালে প্রসূত সন্তানদেরকে সে তার সন্তান হিসেবে গণনায় বা স্বীকৃতির মধ্যে রাখতে পারে। কিন্তু এ ব্যবস্থা পুরুষরা বদলে ফেলতে চাইবে। অতীত ও বর্তমানের মানবসমাজে মাতা শাসিত পারিবারিক ব্যবস্থা আমরা তেমন একটা দেখিনা।

২.৩। প্রাকৃতিক পিতা-শাসিত পরিবার

এরূপ সমাজ গড়ে উঠে পিতার নেতৃত্বে ও পিতাকে কেন্দ্র করে। সন্তান উৎপাদনের জন্য পুরুষ অন্যান্য পরিবার থেকে এক বা একাধিক নারীকে নিজের পরিবারে এনে রাখে। মাতা শাসিত পরিবার অবাধ যৌনতার ভিত্তিতে সম্ভব হলেও পিতা শাসিত পরিবারে তা সম্ভব নয়। স্বামী তার স্ত্রীকে অন্য পুরুষের কাছে যেতে দেবে না। কাজেই একটি অস্থায়ী বা স্থায়ী সমঝোতা বা চুক্তি বা বিবাহ এখানে আবশ্যক হয়।

২.৩.১। অস্থায়ী বিবাহ ভিত্তিক পিতা-শাসিত পরিবার

গর্ভধারণ ও সন্তানকে স্তন্যদানের কালকে গুনলে মোটামুটি তিন বছর অন্ততপক্ষে স্ত্রীকে পরিবারভুক্ত রাখতে হয়। কালের দৈর্ঘ্যে কিছু হের ফের করা গেলেও সময়কালটি বেশ দীর্ঘই থেকে যায়। ফলে শর্ত ছাড়া কোন নারী একাজে এগুনোর কথা নয়। এটিকে আমরা তাই অস্থায়ী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার বলতে পারি। কিন্তু নারীর জন্য এটি মোটেই গ্রহণীয় নয়। নারী গর্ভ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুতির মধ্যে পড়তে পারে, কিন্তু নিজের সন্তান থেকে সরে যেতে সে চাইবে না। কারণ নারীর গর্ভধারণ ও স্তন্যদান নারীকে তার মূর্ত অস্তিত্বশীল সন্তানের সাথে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় সম্পর্কে আবদ্ধ করে ফেলে। চুক্তিভঙ্গের দায়ে দোষী হলেও সে সন্তান ছেড়ে যেতে চাইবে না, আর বিনা দোষে তাকে সন্তান থেকে দূরে সরিয়ে দিলে তাকে সে খুবই অত্যাচারমূলক কাজ বলে মনে করবে। কাজেই স্থায়ী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার ছাড়া নারী চুক্তি করতে চাইবে না। সন্তানরাও নিজেদের মায়ের সান্নিধ্য ও স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়—যা তাদের জন্য একটি বড় বঞ্চনা।

২.৩.২। স্থায়ী বিবাহ ভিত্তিক পিতা-শাসিত পরিবার

স্থায়ী বিবাহ ভিত্তিক পিতা-শাসিত পরিবারে মাতা সন্তানের সান্নিধ্যে থাকতে পারে। কিন্তু এখানে স্ত্রী বিপন্ন হয়ে উঠে। তার স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সংকটের মধ্যে পড়ে। এক নারীর কোলে অন্য নারীর সন্তান তুলে দেয়া যায় না, কারণ গর্ভ ধারণ, লালন ও সন্তান প্রসব দশ মাস দীর্ঘ একটি প্রসেস ও বিরাট ঘটনা। এখানে গোপন করার বা লুকানোর কিছু নেই। নারী সেজন্য নিরাপদ অন্যের সন্তানের ভারবহন ও উত্তরাধিকারের সমস্যা থেকে। কিন্তু এক পুরুষের ঘরে অন্য পুরুষের সন্তান নিয়ে আসা সহজ, কারণ গর্ভধারণের সূচনাটি সংক্ষিপ্ত সময়ের ও তা গোপন রাখা সম্ভব। এটি গোপন রাখারই বিষয়। পুরুষ তাই শঙ্কিত, অন্যের সন্তানের ভার ও উত্তরাধিকার নিয়ে। পিতা-শাসিত পারিবারিক সংস্থায় নারীর উপর নজরদারী ও তাকে কর্তৃত্বাধীনে রাখার জন্য পুরুষের ইচ্ছার ও মরিয়া হয়ে উঠার এটিই মূল কারণ। এজন্য সে নারীর জন্য এমন মূল্যমান ও আদর্শ তৈরি করে যা পুরুষের শঙ্কা হ্রাসে সহায়ক হয় এবং যেন নারী নিজেই বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুরুষের অনুগত হয়ে চলে। পিতা-শাসিত পরিবারে নারী এজন্য বিপন্ন হয়ে উঠে।

নারীর কোরান – ১ (ভূমিকা)

১.১। আল্লাহ কি কোরানের মাধ্যমে পুরুষদের উপর একটি পুরুষতান্ত্রিক বা পুরুষশাসিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করার ও তা রক্ষা করে চলার দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেছেন? আমরা যারা কোরান অথবা কোরানের কোন অনুবাদ/ভাষ্য পড়েছি তাদের নিকট প্রশ্নটি উত্থাপন করা গেলে যে উত্তর পাওয়া যাবে বলে আমি আশা করছি তার ভিত্তিতে আমরা সম্ভবত প্রধানত চারটি ভাগে বিভক্ত হবো— এদের তিনটি দল হ্যাঁ-বাচক উত্তর দেবেন ও একটি দল না-বাচক।

১.২। একদল অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে হ্যাঁ বলবেন এবং আমাদের কালের নারীদের স্বাধীনতা, আত্ম-নির্ধারণ, উন্নয়ন ও সাম্যের দিকে অগ্রগতির পথে কোরানকে বাধা বলে সাব্যস্ত করবেন। আরেক দল হ্যাঁ বলবেন এবং এটিকে নারীদের প্রকৃত নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য আবশ্যক বলে দাবী করবেন। তৃতীয় অংশ বেশ খানিকটা অস্বস্তির সাথে হ্যাঁ বলবেন এবং বিষয়টি ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ বলে আবেদন করবেন। চতুর্থ দলটি স্পষ্টভাবে না উচ্চারণ করলেও তাদের বিরোধীদের নিকট তাদের অবস্থানের পক্ষে পাল্টা ভাল যুক্তি উপস্থাপন করতে অসমর্থ হয়ে উঠবেন।

১.৩। প্রশ্নটি উত্থাপনের প্রয়োজন কী?—কেউ কেউ হয়তো উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা এই প্রশ্নটি করে বসতে পারেন। এই পাল্টা প্রশ্ন একটি বিষয়কে পরিষ্কার করে দেয় যে, আমাদের কালে প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশ্নের উত্তর হয় সুবিধাজনক নয়, নয়তো বিষয়টি অস্বস্তিকর, নয়তো তা অত সহজ নয়। কালের প্রসঙ্গ না হয় বাদ দেয়া গেল—নীতিগতভাবে, আমাদের কি জানবার অথবা জানতে চাওয়ার অথবা জানার চেষ্টা করার অধিকার নেই যে, আল্লাহ কোরানে প্রকৃতই কী বলতে চেয়েছেন? এর উত্তরে কেউ ‘না’ বলবেন এটা আমি আশা করছি না।

১.৪। বলা যেতে পারে, দেশের সংবিধান ও আইন নারীর অধিকারের পক্ষে ও পুরুষের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদেরও কর্তব্য তাকে সমর্থন করা। কাজেই কোরানে কি লেখা আছে অথবা কোরানের কোন অনুবাদে বা কোন তফসিরের কে কী লিখল তা নিয়ে কথা তোলার দরকার কী? দরকার নেই বলতে পারতাম যদি দেখতাম দেশে কেউ স্ত্রীকে মেরে অন্ধ করে দিচ্ছে না, গ্রামে সালিশের নামে নারীর উপর নির্যাতন হচ্ছে না এবং এর দায়-দায়িত্ব কোরানের উপর, ইসলাম ধর্মের উপর আরোপ করা হচ্ছে না।

১.৫। কোরানের উপর এই দায় যারা আরোপ করেন তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কোরানের অপব্যাখ্যা করছেন—শুধু এটুকু বললেই আমরা রেহাই পেয়ে যাব না। আমাদের অনুবাদক ও ভাষ্যকারেরাও এই দায় আরোপের ভিত্তি যোগান দেয়ার মত কথা লিখছেন ও বলছেন। কাজেই কোরানের ইন্টারপ্রিটেশন বা অনুবাদ পুনঃ পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন থেকেই যাচ্ছে। এদিক থেকেও আমাদের জানবার অথবা জানতে চাওয়ার অথবা জানার চেষ্টা করার অধিকার রয়েছে যে, আল্লাহ কোরানে প্রকৃতই কী বলতে চেয়েছেন।

১.৬। প্রচলিত ও প্রভাবশালী ধারণা

আমাদের সমাজে যারা কোরানের আদর্শটি উপস্থাপন করেন তাদেরকে দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে একভাগ রীতিমতো নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব পন্থী। অন্যভাগ কিঞ্চিৎ কম কঠোর। এই উভয় পক্ষই ধর্ম ব্যাখ্যার অঙ্গনে অত্যন্ত প্রভাবশালী। কঠোর হোক বা নম্রই হোক, শেষ বিচারে তারা নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য পন্থী। এরূপ ব্যাখ্যাকারদের নিকট থেকে যে তিনটি নীতি পাওয়া যায় সেগুলো নীচে দেয়া হলো:
(ক) সার্বিকভাবে পুরুষরা সার্বিকভাবে নারীদের এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি স্বামী তার স্ত্রীর কর্তা (authority) ও পরিচালক (director) [কঠোর ভাষ্য], অথবা, ব্যবস্থাপক (manager) ও রক্ষক (protector) [নম্র ভাষ্য]।
(খ) স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের আশঙ্কা এবং স্ত্রী কর্তৃক আচরণে নৈতিক আদর্শ ভঙ্গ হওয়ার ক্ষেত্রে তার উপর যন্ত্রণা আরোপ [কঠোর ভাষ্য], অথবা, শিষ্টাচার সম্মতভাবে তাকে শাসন [নম্র ভাষ্য] করতে পারবে স্বামী। উভয় ক্ষেত্রেই স্বামীর নিজের বিচার ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সে স্ত্রীর উপর তার ইচ্ছা আরোপ করতে পারছে।
(গ) এরূপ ক্ষেত্রে যে উদ্দেশ্যে স্বামী একাজ করতে পারবে সেগুলো হচ্ছে: পরিশোধিত মোহরানার অর্থ ফেরত পাওয়া ও স্ত্রীকে অনুগত করা [কঠোর ভাষ্য] অথবা স্ত্রীকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে আনা [নম্র ভাষ্য]।

১.৭। অনুসৃতব্য নীতিগুলো

আমি প্রধানত সুরা বাকারা, নিসা ও তালাক এর কতিপয় আয়াত নিয়েই আলোচনা করবো, যা নিয়ে কেবল আমাদের দেশেই নয়, পশ্চিমেও মুসলিমদেরকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আল্লাহ কোরানে এমন কথা কি সত্যি বলেছেন যার ভিত্তিতে আমরা ১.৬ অনুচ্ছেদে বর্ণীত তিনটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি? এ প্রশ্নের উত্তর খতিয়ে দেখার জন্য যে নীতিগুলো আমি অনুসরণ করবো সেগুলো নীচে লিখলাম:
(ক) কোরানের বিভিন্ন অনুবাদ ও তফসিরের—যেগুলোকে প্রামাণ্য হিসেবেই গ্রহণ করা হয়ে থাকে—মধ্যেই সীমিত থাকা;
(খ) কোরানের একটি শব্দকে একই স্থানে বিভিন্ন অনুবাদক কিভাবে অনুবাদ করেছেন;
(গ) কোরানের কোনো আয়াতে ব্যবহৃত শব্দটি কোরানের অন্যত্র কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে? সে অর্থ বিবেচ্য স্থানে ব্যবহার করা সম্ভব কিনা;
(ঘ) আয়াতের অনুবাদ-বচনটির মধ্যেকার সকল অংশের মধ্যে যৌক্তিক অসঙ্গতি আছে কিনা;
(ঙ) এক আয়াতের গৃহীত অর্থের সাথে অন্য স্পষ্ট আয়াতের বিরোধ আছে কিনা;
(চ) কোন বাক্যের কোন শব্দের ব্যাপক অর্থ কন্টেক্সটের দোহাই দিয়ে সীমিত না করা, যদি ব্যাপক অর্থটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুসঙ্গত হয়;
(ছ) কোন সর্বনাম কোন বিষয়কে বুঝচ্ছে বা নির্দেশ করছে তা কন্টেক্সট অনুসারে সঙ্গতভাবে নির্ধারণ করা;
(জ) সুসঙ্গত অর্থ/অনুবাদ কি হতে পারে তার প্রস্তাবনা।

১.৮। কোরানে শব্দ ব্যবহারে প্রিসিশন

কোরানে নীতি নির্ধারণে ও আইন প্রণয়নে শব্দের নির্বাচনে একটি প্রিসিশন আছে। কোরানে নারী-পুরুষ সংক্রান্তে যা বলা হয়েছে তাতে যাকারিন (লিঙ্গগত সার্বিক ধারণা হিসেবে পুরুষ, ইংরেজিতে মেইল), উনসা (লিঙ্গগত সার্বিক ধারণা হিসেবে নারী, ইংরেজিতে ফিমেইল), রিজাল (মূর্ত অস্তিত্বশীল ব্যক্তি পুরুষ, ইংরেজিতে ম্যান), নিসা (মূর্ত অস্তিত্বশীল ব্যক্তি নারী, ইংরেজিতে ওম্যান) ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে—যেখানে শব্দ নির্বাচনে বা ব্যবহারে সচেতন প্রিসিশন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই দুই অর্থে নারী ও পুরুষ এর ফারাক লুপ্ত করে ফেললে এবং নারী-পুরুষের সাথে স্ত্রী-স্বামীর ডোমেইন-গত বা সেট-গত সম্পর্ককে গুলিয়ে ফেললে আয়াতের তাৎপর্যের একটি সাবস্টেনশিয়াল অংশ হারিয়ে যেতে পারে।

১.৯। ক্যাটাগরি মিসটেক

পরিবার একজন পুরুষ ও একজন নারীর স্বাধীনভাবে কৃত চুক্তির ভিত্তিতে গঠিত হয়, যার ফলশ্রুতিতে পুরুষ আবার হয়ে উঠে স্বামী এবং নারী আবার হয়ে উঠে স্ত্রী। এই চুক্তিকে আমরা মুসলিমরা বিবাহ বলে অভিহিত করে থাকি। এখানে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, স্বামী পুরুষের, এবং স্ত্রী নারীর সাবসেট মাত্র; স্বামী-স্ত্রী পরিবার নামক স্বাধীন চুক্তি জাত সংগঠনের সাথে সম্পর্কিত, কিন্তু নারী-পুরুষ এমন দুই বৃহত্তর ক্যাটাগরি যাদের মধ্যে এরূপ কোন আবশ্যিক অথবা স্বাধীন চুক্তি নেই। এখন নারী-পুরুষ সংক্রান্ত কথায় নারী-পুরুষকে স্ত্রী-স্বামীতে সীমিত করে ফেললে অসঙ্গতি ও অন্যায্য কথার উৎপত্তি হতে পারে। একইভাবে স্বামী-স্ত্রী শব্দযুগলও পিতা-মাতার সাথে সর্বদা ও নির্বিচারে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী চুক্তির সমমর্যাদার অধিকারী দুই স্বাধীন পার্টনার, যাদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা কৃত চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কিন্তু পরিবার পরিচালনায় তারা প্রধানত পিতা ও মাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। কোরান নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির জন্য ক্যাটাগরি-বিভ্রান্তি বা ডোমেইন-বিভ্রান্তি বা সেট-বিভ্রান্তি প্রধান কারণ।

১.১০। আমি এখন পরিবারের সম্ভাব্য কাঠামো কতভাবে হতে পারে তা খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করবো। তারপর আলোচনা করতে চেষ্টা করবো নারী-পুরুষ ও স্বামী-স্ত্রী বিষয়ে কোরানের প্রাথমিক ধারণাবলী নিয়ে। এবং তারপর শুরু করতে চাই মূল আলোচনাটি।

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৩

স্বব্যাখ্যাত জগত ও জীবনের প্রশ্ন

একটি চমৎকার প্রোগ্রামের বৈশিষ্ট্য কী হতে পারে? এমন প্রোগ্রাম কি লেখা সম্ভব যা স্বব্যাখ্যাত হতে পারে? যদি হয় তবে কি বলা যায় যে, এটি সবচেয়ে কুশলী প্রোগ্রাম এবং এর রাইটার একজন নিখুঁত প্রোগ্রামার? প্রোগ্রামটিকে যদি স্বব্যাখ্যাত হতে হয় তবে প্রোগ্রামের মধ্যে তার অংশ হিসেবে এমন এজেন্ট থাকতে হবে যে প্রোগ্রামের অভ্যন্তরে প্রোগ্রামারের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম। তাছাড়া, এই প্রোগ্রামটির গঠন এমন হতে হবে যে, প্রোগ্রামটির নিয়মগুলো এবং এমনকি উৎপত্তির ব্যাখ্যাটিও প্রোগ্রামের মধ্যে থাকবে যা এজেন্টের পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ বাইরের কোন প্রোগ্রামারের অস্তিত্ব কল্পনা করা ছাড়াই প্রোগ্রামটি নিজেকে ব্যাখ্যা করতে পারবে। এথেকে এজেন্ট প্রোগ্রামের পুনরাবৃত্তি ঘটাতেও সক্ষম হবে। এমন একটি প্রোগ্রামকে আমরা স্বব্যাখ্যাত প্রোগ্রাম বলতে পারি। আমাদের জগত কি এরকম একটি নিখুঁত প্রোগ্রামারের কুশলী প্রোগ্রাম?

জগত যে কেবল আছে তা-ই নয়। জগত মানুষের মত সত্তা তৈরি করেছে যে কিনা জগতের বিকাশ ও উৎপত্তির ব্যাখ্যা খুঁজছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে তাতে সে এখন সাহসী আশাবাদী হয়ে উঠেছে যে, সে ‘সবকিছুর তত্ত্ব’ (থিওরি অব এভরিথিং) আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের ভিত্তি কী? বিজ্ঞানের কথার বৈধতা কোথায়? বিজ্ঞানের ভিত্তি মানুষের অভিজ্ঞতা ও মানুষের যৌক্তিক চিন্তা। অভিজ্ঞতা ও চিন্তা ইন্দ্রিয়সমূহ ও বুদ্ধির প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানে পরিণত করার জন্য ও সূত্রবদ্ধ করার জন্য চিন্তার প্রয়োজন। অন্যদিকে, স্মৃতি ছাড়া অভিজ্ঞতা ও চিন্তা সম্ভব নয়।

গণিতের মাধ্যমে মানুষ এই সূত্রবদ্ধ করার কাজটি করে থাকে। প্রতিটি গাণিতিক সিস্টেম কতগুলো প্রাথমিক এক্সিওম এর উপর প্রতিষ্ঠিত। একটি গাণিতিক সিস্টেম প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম হলে এক্সিওমের সেট পরিবর্তন করে নতুন সিস্টেম তৈরি করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, গণিত মানুষের বুদ্ধির সৃষ্টি; এবং তার ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ আমাদের কালে চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং নতুন আর কোন সিস্টেমের সম্ভাবনা ও প্রয়োজন নেই একথা বলার অধিকার আমাদের আছে কি?

বিজ্ঞানের প্রধান অবলম্বন হলো আরোহের নীতি। এই নীতি দৈনন্দিন জীবনে আমরা সবাই ব্যবহার করে থাকি। আমরা দেখেছি, শুনেছি যে অন্যেরা দেখেছে—আগুনে যে হাত দিয়েছে তার হাত পুড়েছে। তাই আরোহের নীতি অনুযায়ী আমরা বলি, আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায়। এই নীতির পেছনে কাজ করে আমাদের এই বিশ্বাস যে, জগত সুশৃঙ্খল। জগত সুশৃঙ্খল—এটি বিজ্ঞানেরও ভিত্তি। আরোহের নীতি বাদ দিয়ে বিজ্ঞান হয় না। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, কয়বার দেখলে তা থেকে সাধারণ সূত্র তৈরি করা যায়?

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, বিজ্ঞান মানুষের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, স্মৃতি, গণিত, যুক্তি ও আরোহের নীতির বৈধতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলোর পরম বৈধতা কাণ্ডজ্ঞানের কাছে প্রশ্নাতীত। বিজ্ঞানের ভিত্তির মধ্যে যে এনথ্রপোমরফিক এলিমেন্টগুলো রয়েছে তা থেকে বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। সেরূপ চেষ্টাকে চোখ ব্যতিরেকে দেখার এবং বুদ্ধি ব্যতিরেকে চিন্তা করার প্রয়াসের মত হবে। তাহলে বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও সূত্রাবলীর কি তবে কোন মূল্য নেই? বিজ্ঞানই তো আমাদের জীবনকে বাস্তবে পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানের প্রয়োগকে যথেষ্ট কার্যকর দেখতে পাচ্ছি আমরা আমাদের সমকালীন জীবনে। তাহলে কী এটি ধরে নিতে হবে যে, যা কিছু কার্যকর, যা কিছু সুফলপ্রসূ তা-ই সত্য? কাণ্ডজ্ঞান এখানেও সন্তুষ্টচিত্তে হ্যাঁ-বাচক উত্তর দেবে।

সঠিক এক্সপেরিমেন্ট থেকে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, আবার ত্রুটিপূর্ণ এক্সপেরিমেন্ট থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার নজীর ও সম্ভাবনা দুটোই বিজ্ঞানে রয়েছে। গতকাল যা সঠিক বলে মনে করার পর্যাপ্ত যুক্তি ছিল বলে মনে করা হয়েছিল আজ তা পরিহার করতে হচ্ছে। আজ যা সঠিক বলছি তা কাল পরিত্যাজ্য হবে না তা কে জোর দিয়ে বলতে পারে? যারা সব কিছুকেই বিচার করে দেখতে চান তারা বিজ্ঞানের কথাকে আপেক্ষিক, টেনটেটিভ, প্রায়োগিক মূল্য যুক্ত এবং জোরালো প্রত্যাশা হিসেবেই কেবল দেখবেন। বিজ্ঞান ‘রিফাইন্ড কমন সেন্‌স’-এর বেশী কিছু নয়। বিজ্ঞানকে পরম সত্য আবিষ্কারের টুল হিসেবে দেখতে হলে মানুষের জ্ঞানবৃত্তিকে পরম হিসেবে দেখতে হবে, জগত যেভাবে মানুষের নিকট ধরা দিয়েছে জগত আদতে সেটাই—এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমাদের গাণিতিক সিস্টেমগুলোকে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমাদের সামর্থ্যকে চূড়ান্তভাবে নির্ভুল সক্ষমতা হিসেবে ধরে নিতে হবে।

এই জগতের সমস্ত প্রপঞ্চের ব্যাখ্যা দেয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে—এটি আশা করা যেতে পারে। জগতের উৎপত্তির ব্যাখ্যাও মানুষ দিতে পারবে; এমনকি একটি সরলতম সূত্রের মাধ্যমে আমাদের সমগ্র জগতের শুরু থেকে শেষতক পুরো ইতিহাসটিকে লিখে দিতে পারবে। এটি করা গেলেই জগত স্বগতভাবে বাস্তব এবং জগত স্বসৃষ্ট একথা বলার অধিকার জন্মায় কি? একটি ভার্চুয়াল জগত বা সুনিপুণ ও দীর্ঘস্থায়ী স্বপ্নের জগতেও এটি সম্ভব।

জগতকে কাজে লাগানোর জন্য জগতকে জানা প্রয়োজন। এই প্রয়োজন জগতকে জানার যথেষ্ট যুক্তি। কিন্তু জগত আমা দ্বারা জ্ঞাত হবে—এইটিই কি সর্বোচ্চ মূল্যবান কিছু? এটি সাধিত হলেই মানুষের জীবন ও জগত প্রক্রিয়া সার্থক হলো বলা যায় কি? আমরা কি তাহলে জগতের জ্ঞাত হওয়ার বাহন মাত্র? বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা কি তবে এক শ্রেণীর এলিট যাদেরকে সৃষ্টি করাই প্রকৃতির উদ্দেশ্য ও অন্যেরা নিছক তাদের আবির্ভাবের ক্ষেত্র তৈরির সেবাদাস? আমরা বেশীর ভাগ মানুষ কি তবে বেগার খাটার জন্য? আর এতে যে সুখটুকু পাচ্ছি তাতেই কি জীবনের সার্থকতা? বিজ্ঞান যতই অগ্রসর ও সফল হোক না কেন, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের প্রশ্ন ‘টু বি অর নট টু বি’ বা এনিগ্‌মা’র কার্লই’র প্রশ্ন ‘হোয়াই’ এর উত্তর অজানাই থেকে যাবে।(১)

তাছাড়া, এই ব্যাখ্যায় সাফল্য মানুষকে কী এনে দিতে পারে, যদি মানুষের জীবনের মূল্য, উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যকে বড় করে দেখা হয়? জগতের ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেও এবং ঈশ্বরের প্রয়োজন ছাড়াই জগতের উৎপত্তি ও বিকাশ ব্যাখ্যা করা গেলেও ব্যক্তির জীবনের প্রয়োজন তা পূরণ করতে পারে না। আমাদের পক্ষে তখন কী বলা সম্ভব?—জীবন একটি সুযোগ, জগত একটি নিখরচা রেস্তোরা, যে কদিন বাঁচি উপভোগ করি; অথবা, জীবন একটি দুর্ভাগ্য, জগত একটি কষ্টের কারাগার, যাদের বিনাশেই দুঃখের অবসান। কিন্তু ঈশ্বরের সাথে যুক্ত ব্যক্তি সহজেই একথা বলতে পারেন: ঈশ্বরের অস্তিত্ব আমার জন্য একটি সৌভাগ্য, নয়তো আমার এ জীবন নিয়ে আমি করতামটা কী?

জগতের কারণের সাথে নয়, ব্যক্তির জীবনের উদ্দেশ্য, মূল্য ও তাৎপর্যের সাথেই তাই ঈশ্বরের সম্পর্ক মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

… ... ...

(১) শেক্সপিয়ারের প্রশ্নটি এসেছে হ্যামলেটের মুখ থেকে। “বেঁচে থাকব, নাকি আত্মহত্যা করব, সেটাই যে প্রশ্ন।” এটিই সেই মূলগত অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন। এনিগ্‌মা একটি সংগীত প্রতিষ্ঠান, মাইকেল ক্রেটু—যাকে অনেকে কার্লই বলে ডাকেন—প্রতিষ্ঠানটির একাধারে মূল সংগঠক, গায়ক ও একোস্টিক প্রকৌশলী। এনিগ্‌মা’র গানে এই ‘হোয়াই’ বা ‘কেন’ একটি সোচ্চারে উচ্চারিত প্রশ্ন। শেক্সপিয়ারের বড় আকারের প্রশ্নটির পরিসরের চেয়ে এক শব্দের ‘কেন’র পরিসর অনেক বড়। বাঁচতে চাইলে প্রশ্ন হতে পারে, কেন বাঁচব; মরতে গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন মরবো? জগত থাকলে প্রশ্ন করা যায়, জগত কেন? কোন কিছু না থাকলেও প্রশ্ন করা যায়, কোন কিছু নেই কেন?(২) ঈশ্বরের বেলাতেও এ প্রশ্ন প্রযোজ্য, ঈশ্বর কেন? থাকেনই যদি তো একাই থাকতেন, জগত সৃষ্টি করে একটি ‘ভেজাল’ বাঁধাতে গেলেন কেন?(৩)

(২) কিছুই যদি না থাকতো তবে প্রশ্নটিও থাকতো না—একথা তো মানতেই হয়। তবুও আমরা যেহেতু আছি তাই সম্ভাব্য বিকল্প চিন্তা করে এই জগতেই প্রশ্নটা করতে পারি।

(৩) কোরানের ২:৩০ আয়াতে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সৃষ্টির কথা আছে। সেখানে ফেরেশতারা এই সৃষ্টির বিরুদ্ধে ‘কেন’ প্রশ্নটি আল্লাহকে করেছিল। কোরানে প্রশ্নটি থাকলেও, ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, উত্তরটি নেই। আল্লাহ কেবল বলেছেন, “আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।”